প্রতিবাদ করায় গণধর্ষণ: প্রত্যক্ষদর্শী

চেতনায় কুষ্টিয়া প্রতিবেদক ॥ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঈগল পরিবহনের নৈশকোচে ঢাকায় যাচ্ছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সালিমপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী হেকমত আলী। সঙ্গে ছিল দুই সন্তান ও শাশুড়ি। এই পরিবহনে ডাকাতি ও গণধর্ষণের বর্ণনায় তিনি বলেন, ডাকাতদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ঐ নারী বাসযাত্রী।
হেকমত আলী জানান, প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ডাকাতরা বাসের ভেতর তাণ্ডব চালায়। বুধবার সারাদিন তারা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। স্ত্রীর চিকিৎসা না নিয়ে এদিন রাতেই ঘটনাস্থল থেকে বাড়ি ফিরে আসেন তারা।
তিনি বলেন- স্ত্রী, চার বছরের ছেলে, দুই বছরের মেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া বাজার থেকে ঈগল পরিবহনের বাসে ওঠি। বাসে ১০-১৫ জন যাত্রী ছিলেন। বাসটি বনপাড়া হয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জের একটি হোটেলে গিয়ে যাত্রাবিরতি দেয়। বিরতি শেষে রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার দিকে চলতে থাকে। কিছু দূর যাওয়ার পর রাত ১২টার দিকে মহাসড়কের ওপর চার জন তরুণ বাসের সামনে থেকে হাত তুলে ইশারা দেন। বাসচালকের সহকারী সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ওই তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন। দু’এক মিনিটের মধ্যে তরুণরা বাসে ওঠে পড়েন এবং সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে পেছনের দিকে গিয়ে বসেন। এই চার তরুণের প্রত্যেকের মুখে মাস্ক ও একজনের পিঠে ব্যাগ ছিল। তারা পেছনে বসার পরপরই মোবাইল দেখতে থাকেন।
‘বাসটি আরও ১৫ মিনিটের মতো চলে। এরপর রাস্তা থেকে আরও পাঁচ জন একইভাবে ওঠেন। কয়েক মিনিট পর আরেকটু সামনে গিয়ে আরও দুজন বাসে ওঠেন। কিছুক্ষণ পর রাস্তা থেকে উঠা যাত্রীদের মধ্যে একজন বাসচালককে থামাতে বলেন। চালক রাজি না হলে তাকে মারধর করেন। এসময় চালককে সরিয়ে আসনে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন তারা।
এই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ডাকাতরা পুরুষ যাত্রীদের গলায় ছুরি ও কাঁচি ধরে রাখেন। কোনও যাত্রী যেন চিৎকার করতে না পারেন সেজন্য গাড়ির পর্দা কেটে পুরুষ যাত্রীদের মুখ, হাত ও পা বেঁধে সিটের নিচে বসিয়ে রাখেন। বাসে থাকা ১০-১২ জন নারী যাত্রীর মধ্যে একজনের চোখ, মুখ ও হাত বেঁধে ফেলা হয়। বাকিদের খোলা ছিল। বাস তখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে। তবে বাসের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। ডাকাতরা প্রত্যেকের শরীর তল্লাশি করে টাকা, মোবাইল ফোন এবং নারী যাত্রীদের কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার লুটে নেন।
তিনি আরও জানান, সবার সঙ্গে আমারও হাত বাঁধা ছিল। তবে চোখ খোলা ছিল। আমার এক সিট পেছনে ছিলেন এক নারী। তার থেকে দুই হাত দূরে এক নারীকে তল্লাশি করার সময় উনি প্রতিবাদ করেন। ওই নারী ডাকাত দলকে বলেন, ‘তোরা যে কাজ করছিস, সেটা ঠিক নয়। আমার এলাকা পাবনায় হলে তোদের দেখে নিতাম।’ এ কথা শোনার পর দুই তরুণ ওই নারীকে মারধর করেন এবং পেছনের একটি সিটে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন।
হেকমত আলীর স্ত্রী জেসমিন আরা বলেন, আমার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মাথা নিচু করে সৃষ্টিকর্তার নাম নিচ্ছিলাম। সামনের আরেক সিটে আমার মা বসেছিলেন আরেক সন্তানকে নিয়ে। এক শিশু কান্না করলে ডাকাত দলের একজন এসে ধমক দেন। তাদের মতো ছিনতাইকারী না হওয়ার পরামর্শ দেন।
হেকমত আলী ও তার স্ত্রী জেসমিন বলেন, ডাকাত দলের সরদারকে তারা ‘কাকা’ বলে সম্বোধন করছিলেন। নুরু, সাব্বির, রকি নামেও কয়েকজনকে তারা ডাকেন। রাত ৩টার দিকে ডাকাতরা টাকা, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি শুরু করেন। বাসের ভেতরে ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। সব কাজ শেষ করে সড়কের এক পাশের একটি খাদে গাড়িটি রেখে দ্রুত তারা নেমে চলে যান। গাড়ির প্রায় সব যাত্রীকেই তারা মারধর করেন।
হেকমত আলীর শাশুড়ি শিল্পী খাতুন বলেন, ভোরের দিকে যখন পুলিশ আসে তখন কয়েকজন যাত্রীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েকজনকে থানায়। বুধবার সারাদিন আমরা মধুপুর থানাতেই ছিলাম। রাত ৯টার দিকে বিআরটিসির একটি গাড়িতে টিকিট কেটে দিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ।
এ ঘটনায় প্রধান আসামি রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) ভোরে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আদালতে হাজির করে সাত রিমান্ড আবেদন করা হয়। বিচারক শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

Post a Comment

Previous Post Next Post