সবুজের কোলে বগালেক \ প্রভাষক জাহাঙ্গীর হোসেন জুয়েল

চারদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ের উচুতে শান্ত একটি লেক। সবার পরিচিত বান্দরবানের বগালেক। সবুজের কোল জুড়ে রয়েছে বগালেক। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য। পাহাড়ে যে কত রহস্য আর বিস্ময়ে ভরা থাকে তাদেখতে আর উপলব্দি করতে ওই জায়গাগুলোতে গেলেই বোঝা যায়। ৪৮ জনের একটি টিম নিয়ে আমাদের যাত্রা বান্দরবানের বগালেক ।

বান্দরবানের বগালেক বেড়াতে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। একাধারে শিক্ষকতা, সাংবাদিকতাসহ নানা ব্যস্ততার কারণে কোনোভাবে সুযোগটা হয়ে উঠছিলো না। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পেলাম। কিন্তু ভয় ছিল যাওয়া ঠিক হবে কিনা। শেষ পর্যন্ত ভেড়ামারা সরকারি কলেজে পরীক্ষা চলাকালীন সময় ব্যস্ত থাকার পরও হুট করেই জানিয়ে দিলাম আমি যাচ্ছি। বান্দরবানের বগালেক আমার প্রথম ভ্রমণ। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার সহকর্মী, বড়ভাই, বন্ধু ও ছোট ভাইদের সাথে বের হলাম। আমাদের ৪৮ জনের সাথে ছিলো বাসের ড্রাইভার ও হেলপার।
২৫শে নভেন্বর ১৯ ভোর ৪টার সময় বান্দরবান শহরের একটি হোটেল থেকে চান্দের গাড়িতে আমরা উঠি। ৪টি চান্দের গাড়িতে ২জন গাইড মোট ৫০ জনের একটি টিম বগালেক এর উদ্দেশে রওনা হয়। ভোর বেলায় রুমা থানার সামনে গাড়ীটি থেমে যায়। গাইড জানান থানার কতৃপক্ষকে অবগত করতে হবে। থানার সামনে যাত্রী ছাউনি’র সামনে ৪টি চান্দের গাড়িতে থাকা ২জন গাইডসহ ৫০জন গাড়ি থেকে নেমে অপেক্ষা করতে থাকি। প্রায় ১ ঘন্টা পর থানা কতৃপক্ষ একটি রেজিস্টার্ড খাতা দেয়। সেই খাতায় আমরা ৪৮জন তাদের নাম ও ঠিকানা লেখার পর যার যার গাড়ীতে সে উঠে পড়ে। আবার ৪টি চান্দের গাড়ি ছুটতে শুরু করে। সকাল ৭টার সময় রুমা বাজারে পৌছায়। এবার সবাই সকালের নাস্তা ও অন্যান্য কাজ সেরে নেয়। এরপর রুমা বাজারে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিসহ ৪৮ জনের নিজ নিজ তথ্য দেওয়া হয়। সবকিছুই আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে। পুরো কাজটি ২জন গাইড সহযোগিতা করেন। এর পর রুমায় সেনাবাহিনীর দপ্তরে ৪৮ জনকে একে একে ডাকা হয়। সবাই লাইন ধরে একে একে হাজিরা হয়ে খাতায় সই করে । সেনাবাহিনীর দপ্তরে সকল কাজ শেষ করে আবার ৪টি চান্দের গাড়ি বগা লেক এর উদ্দেশে রওনা হয়।
বগালেক এর উদ্দেশে রওনা হলে সবুজের কোল আর পাহাড়ের বুকে পিচঢালা পথ ধরে অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন যে বগালেকে পৌঁছে যাবেন টেরই পাবেন না। তবে বগালেকের শেষ খাঁড়া পাহাড়টিতে ওঠতে আপনার বুক কেঁপে উঠবে নিশ্চিত। বগালেকে পৌঁছে প্রথমে আপনাকে স্থানীয় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে। তারপর বগালেক আপনার। লম্বা সময় জার্নি শেষে যখন আপনার চোখের সামনে প্রত্যাশিত বগালেক তখন উচ্ছ্বসিত হওয়াটা স্বাভাবিক। সেখানকার আর্মি ক্যাম্প থেকে পাহাড় থেকে পুরো লেকটি দেখে আপনার চোখ ও মন জুড়িয়ে যাবে। আর বলতে থাকবে এত সুন্দর! আগে কেনো আসিনি। চারদিকে সবুজ আর পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলাধার বগালেক। ইচ্ছে করবে এখনি নেমে লেকের পানিতে দাপাদাপি করি। এ যেন নীল আকাশ-পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতিও ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া! বগালেকে যাবেন আর বগালেকের পানিতে দাপাদাপি করবেন না তা কি হয়। কিন্তু সব সময় মনে রাখতে হবে জীবনের মূল্য সবচেয়ে বেশি। সাঁতারে পারদর্শী হলেও বেশি দূরে না যাওয়াই শ্রেয়। লেকের নিচে আছে পাথর। পাথরে আঘাত লেগে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। তাই সাবধান। যারা সাঁতার পারেন না কিন্তু পানিতে নামতে চান তারা চাইলে পাড়ের কাছে হাঁটু পানিতে নেমে গোসল করে নিতে পারেন। এখন ওই লেকের সৌন্দর্য পর্যটকরা উপভোগ করতে পারলেও লেকে নামার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এই সংক্রান্ত একটি নিষেধাজ্ঞার কাগজ আপনাকে রুমায় তথ্য দেওয়ার সময় পূরণ করতে হয়। যেখানে আপনি লেকে নামবেন না মর্মে অঙ্গীকার করা লাগে। যদিও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পাড়ের কাছে নেমে গোসল করা যায়।
বগালেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, কিন্তু মোবাইল বা ক্যামেরার ব্যাটারি টাকা দিয়ে চার্জ দেওয়া যায় বিশেষ ব্যবস্থায়। বগালেক ঘেঁষা পাহাড় বগালেকের আশপাশে রয়েছে একটি ছোট গ্রাম। আর এই গ্রামে বসবাস করে বম সম্প্রদায়। এই বম সম্প্রদায়ের জনসাধারণ অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। যে কোনো একটি বম সম্প্রদায়ের বাসায় রাতযাপন করা যায়। জনপ্রতি খরচ হয় মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকা। আর খাওয়ার জন্য বম সম্প্রদায়ের পরিবার গুলোতে অর্ডার করলেই মিলবে সুস্বাদু খাওয়ার।
ভেড়ামারা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মোস্তাফিজুর রহমান শামীম বলেন, বান্দরবানের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হলো বগালেক। এই লেক শুধু একটি লেকই নয়, এটি যেন একটি শিক্ষালয়। পাহাড়ের দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পর্যটকদের এই লেকে আসতে হয়। আর এই লেকের পরম বাতাসে মন জুড়িয়ে যায় সবার।
সরকারি তথ্য বাতায়ন বলছে, রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নে দুই হাজার ৭শ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত লেকটি। প্রায় ১৫ একরের এই লেকের গঠন শৈলী দেখে মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার সাধু পানির হৃদ এটি। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম ২০০৫ সালে প্রথম বগালেকের পরিমাপ করেন। তার দাবি অনুযায়ী বগালেকের উচ্চতা এক হাজার ৭৩ ফুট এবং গভীরতা ১১৫ ফুট।
লেকের রহস্য রয়েছে আরো! স্বাভাবিকভাবে বগালেকের পানি স্বচ্ছ নীল হলেও তিন থেকে চার বছর পর পর লেকের পানি ঘোল হয়ে যায়। রং অনেকটা কাদামাখা পানির মতন ঘোলাটে। তিন থেকে চার দিন পানির রং ঘোলাটে থাকার পর ফের স্বাভাবিক রংয়ে ফিরে আসে। তবে কেন এমন ঘটনা তা এখনো অজানা।
বগালেককে ঘিরে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পর্যটকদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

প্রভাষক জাহাঙ্গীর হোসেন জুয়েল
সভাপতি
ভেড়ামারা প্রেসক্লাব
 এসএসসি ১৯৯১
ভেড়ামারা সরকারি পাইলট মডেল স্কুল
ভেড়ামারা,কুষ্টিয়া।
মোবাইল-০১৭১১-৪৮১৮২১
ই-মেইল-
jewel481@gmail.com

Post a Comment

0 Comments