রাষ্ট্রনায়কের ৭৫

চেতনায় কুষ্টিয়া প্রতিবেদক ॥ আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন। দেড় যুগের মতো বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে তিনি যেমন ঐক্যবদ্ধ করেছেন, তেমনি তার নেতৃত্বে দেশ একটি দারিদ্র্যপীড়িত রাষ্ট্র থেকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
দিনটি ছিল ১৯৮১ সালের ১৭ মে। ওই সময়ের রাজনীতির মতো প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। দীর্ঘ ছয় বছরের যন্ত্রণাদগ্ধ নির্বাসন শেষ করে দেশের মাটিতে পা রাখেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
যে পিতা জীবনের সুবর্ণ সময়গুলো সঁপে দিয়েছিলেন বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে, অন্তরালে থেকে যে মা সাহস যুগিয়েছেন পিতার সংগ্রামে, দেশের স্বাধীনতার জন্য যিনি বিসর্জন দিয়েছেন ব্যক্তিগত আনন্দ, কিংবা আদরের ভাই - কেউ ছিল না সেদিন বিকেলবেলা শেখ হাসিনাকে বুকে টেনে নেয়ার।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এ সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় ঘাতকদের নির্মমতার হাত থেকে বেঁচে যান।
১৯৮১ সালের সেই বিকেলে (সাড়ে ৪টায়) ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের বোয়িং বিমানে ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে পৌঁছান শেখ হাসিনা।
কালবৈশাখী উপেক্ষা করে মুজিবকন্যাকে বরণ করে নিতে সেদিন ছিলেন লাখো কর্মী-সমর্থক। তাদের অফুরান ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, অঝোরে কাঁদলেন তিনি। জনতার সমুদ্রে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ থেকে যেন নিঃসৃত হচ্ছিল না কোনো শব্দ। বলেছিলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছুই নেই।’
নিজেকে সামলে নিয়ে শেখ হাসিনা সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’
৩৪ বছর বয়সী শেখ হাসিনার এই ফিরে আসা ছিল দেশের একটি রাজনৈতিক আদর্শ ও ধারার ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রাবিন্দু। এর ১৫ বছর পর ১৯৯৬ সালে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
দেশভাগের বছর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানের পূর্ব অংশের গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় ২৮ সেপ্টেম্বর জন্ম শেখ হাসিনার।
আনন্দ, সংগ্রাম, বেদনাবিধুর নানা ঘটনাপ্রবাহের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী তিনি; সব মিলিয়ে চারবার। ৭৫ বছর বয়সে এসে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় শেখ হাসিনা। এমন এক সময় তিনি পঁচাত্তরে পা দিলেন যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার অভ্যুদয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। সেদিক থেকে এই রাষ্ট্রের নিয়তির সঙ্গে শেখ হাসিনার জীবন জড়িয়ে আছে। খুব কম রাষ্ট্রনায়কের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটেছে।
নিজের অর্জনেই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তবে আরও একটি পরিচয় তাকে বড় করে তোলে; জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে তিনি।
শেখ হাসিনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। শিশু বয়সেই চলে আসেন ঢাকায়। বড় হয়ে ওঠা সেখানেই।
শেখ হাসিনা মাধ্যমিক বা মেট্রিক পাস করেন ঢাকার আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে। এরপর ভর্তি হন সে সময়ের ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজে (বর্তমান বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়)। স্নাতক পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
দুই সন্তানের জননী শেখ হাসিনা। ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে বিয়ে করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় ২৭ জুলাই জন্ম হয় প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়ের। ১৯৭২ সালের ৯ ডিসেম্বর জন্ম নেয় কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।
দলের দায়িত্ব নেয়া
দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা যখন দেশে ফিরে আসেন, ওইদিন তাকে ৩২ নম্বরে নিজ বাড়িতে যাওয়ার অধিকারটুকুও দেয়া হয়নি। দেশ তখন সামরিক শাসনের যাঁতাকলে। শাসক তখন জিয়াউর রহমান।
এমনকি মিলাদ পড়তেও ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঢুকতে পারলেন না সেদিনের শেখ হাসিনা। উল্টো ঢাকায় সরকারি অনুদানে বাড়ি দেবার প্রস্তাব দিলেন জেনারেল জিয়া। তাতে সায় না দিয়ে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি।
তারপর স্বাধীন দেশে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। দেশে ফেরার আগেই নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আওয়ামী লীগের দায়িত্ব দিয়েছিলেন শেখ হাসিনার কাঁধে।
১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
‘জীবনের ঝুঁকি নিতেই হয়, মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হতে হয়’- নিজের কথাটি ধারণ করেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথ কাঁপিয়ে দেন শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনার সেই প্রত্যাবর্তনকে ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট’ বলে মনে করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।
জাতীয় নেতায় রূপান্তর
বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জাতীয় তার নেতা হত্যার বিচার ও স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সার্বভৌম সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শুরু হয় শেখ হাসিনার নতুন যুদ্ধ।
আন্দোলন ও সংগ্রামের পথ বেয়ে ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে হন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। সেনাশাসক এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে ফেরা দেশেও সংসদে একই ভূমিকা পালন করেন তিনি।
২১ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ১৯৯৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। দেশে প্রথম কোনো সরকারের পাঁচ বছর টিকে থাকার রেকর্ড গড়েন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথম নজিরও রাখেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।
২০০১ সালের নির্বাচনে এসে ভরাডু্বি হয় আওয়ামী লীগের। হেরে যাওয়ার কারণটাও বহুবার নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেছেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা। দেশের সম্পদ বিক্রির মুচলেকা না দেয়ায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
২০০৮ সালে এসে বদলে যায় দৃশ্যপট। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শুরু হয় দিন বদলের সংগ্রাম। বদলে যেতে থাকে বাংলাদেশের চিরচেনা দুর্ভোগ। দেশজুড়ে শুরু হয় উন্নয়ন যার পেছনে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের পর সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পান বঙ্গবন্ধুকন্যা। তার শাসনামলেই নিম্ন আয়ের দেশের তকমা থেকে বের হয়ে, মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারেও উঠে এসেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে এখন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তি মনে করা হয়।
শেখ হাসিনার শাসনামলে সমুদ্রে রচিত হয়েছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব। টেবিল বৈঠকে নিষ্পত্তি হয়েছে ছিটমহল বিনিময়ের মতো দীর্ঘলালিত জটিল একটি সমস্যার। মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে সীমান্ত খুলে দিয়েছেন তিনি। যার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে বলা হয় ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’।
বিদ্যুৎখাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ভেঙে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মার বুকে নির্মাণের শেষ প্রান্তে রয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। রাজধানীবাসীর দীর্ঘদিনের যানজট সংকটের স্থায়ী সমাধানে আগামী বছরই চালু হচ্ছে মেট্রোরেল। সব মিলিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশের যে যাত্রা, তার সবকিছুই এসেছে শেখ হাসিনার হাত ধরে।
বৈষম্য কমিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে নেয়ার দিকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজ করে চলেছেন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।
তিনি বলেন, ‘আমরা সঠিক পথে আছি, আমরা এগিয়ে চলছি। করোনা ব্যবস্থাপনাতে আমরা অনেক ভালো করেছি।’
দ্বিতীয় ঢেউ চোখ রাঙালেও তার লাগাম টানা গেছে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশে যখন করোনা প্রতিরোধী টিকা প্রয়োগ শুরু হয়, তখন বিশ্বের ১৩০টি দেশ একটি টিকাও পায়নি।’
এই কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলেও মন্তব্য তার।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পেয়েছেন একাধিক স্বীকৃতি। প্রশংসিত হয়েছেন নানা উদ্যোগের কারণে। পেয়েছেন একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা।
শেখ হাসিনা এখন অনেক পরিণত। নিজ দেশে ফেরার কথা স্মরণ করে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে তিনি বলেন, ‘ওই অবস্থার ভেতরেই কিন্তু আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি। আমি জানতাম, আমি যখন ফিরব যে কোনো সময় হয়তো আমার ভাগ্যে একইরকম ঘটনা ঘটতে পারে। যে কোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। সে জন্য কিন্তু পিছিয়েও যাইনি, থেমেও থাকি না। সেটা আমি চিন্তাও করি না।’
বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি দেশকে এগিয়ে যেতে যে ধরনের বিনিয়োগ, বাণিজ্য, রেমিট্যান্স প্রবাহ দরকার ছিল, সেগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথাযথভাবে করতে পেরেছেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের যে পরিচয়টা ছিল, বিশেষ করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে একটা তলাবিহীন ঝুড়ি বা ক্ষুধা দারিদ্র্যপীড়িত একটা রাষ্ট্র, সেই ভাবমূর্তিটাকে তিনি পুরোপুরি মুছে দিতে পেরেছেন।’
জাতীয় নেতা থেকে বিশ্ব দরবারে
অকুতোভয় এই নারী এখন বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছেন বিশ্বনেতা। বয়স হার মানিয়ে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বিশ্ব রাজনীতি। জাতিসংঘের মতো বিশ্বসভায় মহামারি করোনা প্রতিরোধে টিকা বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার। সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করতে তিনি বললেন, টিকা প্রযুক্তি উন্মুক্ত করার কথা যেন সামর্থ্যবান সব দেশে টিকা উৎপাদন করে সংকট দূর করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দরিদ্র দেশগুলোর নেতা হিসেবে ক্ষতিপূরণ আদায়ে লড়ে যাচ্ছেন বিশ্বমঞ্চে।
২০০৪ সালে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ অন্তত ২১ বার হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে এই নারীকে। তারপরেও পিছু হটেননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে শুক্রবার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংবর্ধনায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘ন্যায় আর সত্যের জন্য যখন কথা বলব, স্বাভাবিকভাবেই জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সে জন্য সত্য কথা বলব না, আর ন্যায়সঙ্গত কথা বলব না - এটা তো হয় না। কাজেই আমি বলে যাচ্ছি। বার বার গেরিলা হামলা, গুলির মুখোমুখি হতে হয়েছে, কারাগারে বন্দি হতে হয়েছে, সেগুলো জানি আমি। জেনেই আমার পথ চলা।’

Post a Comment

0 Comments