আমার চোখে নবীর উদ্দীন

মোস্তাফিজুর রহমান শামীম
মানুষটি কখনোই আগামীকালের চিন্তা করেননি। সবসময় বর্তমান নিয়েই ভাবতেন। ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখে আসছি রাজনৈতিক মতাদর্শের বাহিরে কোনদিন চলেননি। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন থেকে মৃত্যুর ঠিক আধাঘন্টা আগ মূহুর্ত পর্যন্ত তার নিজের রাজনৈতিক দলের পেছনে সময় দিয়েছেন একাগ্রচিত্তে। তার সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন নিজের রাজনৈতিক দলকে।
ভেড়ামারা কলেজ সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ভালো পোশাকাশাকের প্রতি তার কোন মোহ ছিল না। মোহ ছিল না ঘরবাড়ির প্রতিও। কোনমতে মাথা গোজার ঠাঁই পেলেই খুশি থাকতেন। বলছিলাম ভেড়ামারা উপজেলা জাসদের সাবেক সভাপতি ও কুষ্টিয়া জেলা জাসদের জনসংযোগ বিষয়ক সম্পাদক প্রয়াত নবীর উদ্দীনের কথা। তিনি কষ্টকে হাসিমুখে বরণ করে নিতে পারতেন। এজন্যই দলের সংকটময় মুহূর্তে প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কোন প্রকার লোভ-ললসা তার রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র পথভ্রষ্ট করতে পারেনি।  তিনি আমার চাচা।
এলাকার মানুষ যেকোন সমস্যায় পড়লে সবার আগে তিনি ছুটে যেতেন। চাচা আমাকে অনেক ভালোবাসতেন। শাসনও করেছেন অনেক। শাসন করার পর যেকোন উপায়ে আবার মন ভালো করে দিতেও জানতেন। সাদাসিধা ছিলেন। যে কারও কথা বিশ্বাস করতেন।
বিভিন্ন জায়গায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে যখন আমার পরিচয় হয়েছে, তখন তারাও আমার চাচা নবীর উদ্দীনের নাম শুনে এক কথায় বলেছেন- "নবীর ভাই ভালো মানুষ"। একজন রাজনীতিবীদের কাছে এই প্রাপ্তিটা অনেক কিছু বলে আমি মনে করি।
ছোট্টবেলায় চাচা কোলে নিয়ে ঘুরেছেন। চাচার যখন বিয়ে হয়, তখন আমার বয়স ছিল ৪/৫ বছর। আমাকে তার কোলের উপর বসিয়ে নিয়েছিলেন। সে কথা আমার আজও মনে আছে। স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তায় দেখা হলে পকেটে টাকা বুজে দিয়েছেন কিছু কিনে খাওয়ার জন্য। আমি যখন ঢাকায় থাকতাম, তখন তিনি ঢাকায় গেলে আমার কাছে ছাড়া অন্য কোথাও থাকতেন না। সাথে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেন।
আমার ছাত্রজীবন থেকেই আমার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতেন। আমার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব ছিল তার কাছে অনেক। আমি ভেড়ামারাতে স্থায়ী হওয়ার পর মাঝেমধ্যেই শিশুসুলভ আচরণ লক্ষ্য করতাম তার মধ্যে। আমি যদি বলতাম- ওখানে যাবেন না, এখন বাড়ি চলে যান, এই খাবার খাওয়ার দরকার নাই ইত্যাদি ইত্যাদি, আমার কথার বাহিরে যেতেন না।
খাবার প্রতিও তার অনেক নিয়ন্ত্রণ ছিল। কোনদিন তাকে পান খেতে ও ধুমপান করতে দেখিনি। তবে চা খেতেন প্রতিনিয়ত।
কোন রাজনৈতিক প্রোগ্রামে ইচ্ছে করেই সামনের চেয়ারে বসতে চাইতেন না। অনুজদের তিনি সামনে দিতে চাইতেন।কেউ অসুস্থ হলে, কোন সমস্যায় পড়লে বারবার খোঁজ নিতেন।
আমরা সবাই ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়ে এসেছি। কিন্তু স্থায়ী হয়ে থাকে আমাদের আচরণ, ব্যবহার। তার এসব গুণের কারণে প্রচুর মানুষ আজ তাকে শেষ দেখার জন্য এসেছিলেন। জানাজার ময়দানে সব মানুষের একত্রে জায়গা করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আমি একসাথে এতো মানুষ একই ঈদগাহে ঈদের নামাজেও দেখিনি।
তার প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসার চিত্র আজ নিজ চোখে দেখেছি। আমার চাচা শুধু আমাদের পরিবারের নয়, আমাদের গ্রামেরও একজন অভিভাবক ছিলেন। তার রুহের মাগফেরাতের জন্য সবার কাছে দোয়া আবেদন করছি।
শিক্ষক, লেখক ও গবেষক।

Post a Comment

0 Comments