মানবতার কণ্ঠস্বর বঙ্গবন্ধু

শেখ আনোয়ার ॥ পৃথিবীর ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষণজন্মা লড়াকু নেতা। ক্ষণজন্মা মহান মানুষের তালিকা খুব লম্বা থাকে না। কড়গুণে বলে দেয়া যায়। এসব কৃতী মানুষ নিজের কর্মেই সমাজে, দেশে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জ্যোতি ছড়ান। বিশ্ব ইতিহাসে এমন একজন জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার পর জাতীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্ত প্রতিহত করে ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ এবং ১৯৭৪ সালে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ এবং একইসঙ্গে ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার সদস্য পদ লাভ করতে বঙ্গবন্ধুর সরকার সমর্থ হয়। ১৯৭৩ সালে কমনওয়েলথ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের সদস্য পদ লাভ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙালি যিনি জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ দেন এবং বাংলাকে জাতিসংঘের স্বীকৃত ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভারতের সঙ্গে ২৫ বছরের মৈত্রী ও শান্তিচুক্তি, ফারাক্কার পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৪ হাজার কিউসেক পানির ব্যবস্থা বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের বিরাট সাফল্য। মাত্র সাড়ে ৩ বছরের শাসনামলে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিশ্ব শান্তি পরিষদ কর্তৃক সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অমূল্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জুলি ও কুরি শান্তিপদক প্রাপ্তি আজও সব বাঙালির জন্য গৌরবের।
বাংলাদেশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অনেক স্বপ্ন ছিলো। বঙ্গবন্ধু মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতিকে কাজ করতে শিখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিলো দেশটি আত্মনির্ভরশীল হবে। মানুষ দু’বেলা আহার পাবে। মাথার ওপর চাল থাকবে। শিক্ষিত হবে। সমাজে থাকবে সংহতি। তার কিছু কিছু বাস্তবায়ন স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার পর দেশে সমস্যার কোনো অন্ত ছিলো না। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে ছিলো না অবকাঠামো ব্যবস্থা। অর্থনীতির অবস্থাও ছিলো করুণ। এই অবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও দৃঢ় পরিচালনায় দেশ একটি সুন্দর গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলো। মানুষের ভেতর উদ্দীপনা ছিলো। সহনশীলতা ছিলো। শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ছিলো। অসাম্প্রদায়িক চেতনাও ছিলো। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কাক ডাকা ভোরে শেষ হয়ে যায় বাঙালির সব স্বপ্ন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে এদিন হত্যা করা হয়।
যিনি স্বাধীনতার স্থপতি। যিনি স্বাধীন বাংলাদেশর স্থপতি। যিনি না হলে এদেশ স্বাধীন হতো না। তাঁকেই স্বাধীন দেশে প্রাণ দিতে হলো। সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড। এর চেয়ে মর্মপীড়াদায়ক ও দুঃখজনক ঘটনা বাংলার ইতিহাসে আর কী হতে পারে?
বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু নন, বরং তিনি বিশ্ব নেতায় পরিণত হয়ে অভিহিত হয়েছেন বিশ্ববন্ধু হিসেবে। একজন নেতা বিশ্ব দরবারে তাঁর দেশের মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ আত্মপরিচয়ের আলোকে কী অপরিসীম সাহসিকতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তার উজ্জ্বল উদাহরণ স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সারাবিশ্বের মানবতার পক্ষের কণ্ঠস্বর তিনি। বিশ্বের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর অনুপ্রেরণা, সাহস ও শক্তি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের মাতম। স্তম্ভিত হয়ে পড়ে বিশ্বসম্প্রদায়। নোবেলজয়ী পশ্চিম জার্মানীর নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, ‘শেখ মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’
বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার খবর শুনে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমারই দেওয়া ট্যাঙ্ক দিয়ে আমার বন্ধু মুজিবকে হত্যা করেছ! আমি নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছি।’ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজী এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।’ ভারত বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।’ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন,  ‘শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তাঁর অনন্য সাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।’ বৃটিশ লেবার পার্টির এমপি জেমসলামন্ড বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশই শুধু এতিম হয়নি, বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান সন্তানকে।’ বৃটিশ লর্ড ফেন্যার ব্রোকওয়ে বলেছিলেন, ‘জর্জ ওয়াশিংটন, গান্ধী এবং দ্য ভ্যালেরার থেকেও শেখ মুজিব মহান নেতা ছিলেন।’ কিউবার বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’ ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ। তাই তিনি অমর।’ ফিলিস্তিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইয়াসির আরাফাত বলেছিলেন, ‘আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।’ জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কেনেথ কাউন্ডা বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ভিয়েতনামী জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।’
অপরদিকে দ্য টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করে: ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই।’ বিবিসি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘শেখ মুজিব নিহত হলেন তাঁর নিজেরই সেনাবাহিনীর হাতে। অথচ তাঁকে হত্যা করতে পাকিস্তানিরা সংকোচবোধ করেছে।’ ঘটনার পর লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’ অপরদিকে ভারতের বেতার ‘আকাশ বাণী’ ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট তাদের সংবাদ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে জানায়, ‘যিশু মারা গেছেন। এখন লক্ষ লক্ষ লোক ক্রস ধারণ করে তাঁকে স্মরণ করছেন। মূলত একদিন মুজিবই হবেন যিশুর মতো।’ নিউজ উইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ বলে আখ্যা দেয়। ১৯৮২ সালের ৫ এপ্রিল টাইম ম্যাগাজিনে বলা হয়, ‘১৫ আাগস্ট অভ্যুত্থান ও শেখ মুজিবের হত্যার পর গণতান্ত্রিক আমলের অবসান হয়।’ ফিন্যান্সিয়াল টাইমস্ উল্লেখ করে, ‘মুজিব না থাকলে বাংলাদেশ কখনোই জন্ম নিতো না।’ পশ্চিম জার্মানির পত্রিকা লিখেছে, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে চতুর্দশ লুইয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। জনগণ তার কাছে এত জনপ্রিয় ছিল যে, লুইয়ের মতো তিনি এই দাবি করতে পারেন যে, আমিই রাষ্ট্র।’ ‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখেছিল, ‘১৫ আগস্টের ঘটনার ভেতর দিয়ে যেন বাংলাদেশের জনগণ আইয়ুবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় প্রচারণা এবং সামরিক শাসনের কালে প্রত্যাবর্তন করেছে।’
গবেষকদের মতে, যদি ১৫ আগস্টের ওই নির্মম ঘটনার জন্ম না হতো তাহলে বাংলাদেশ আরও অনেক আগেই উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতো। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পুনরায় বিনির্মাণের কাজ। বর্তমান বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে এগিয়ে চলেছে। দেশের আপামর মানুষ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দেশের কাজ করছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে নতুন পরিচয়ে পরিচিত। সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন অনেক দেশের জন্যই উদাহরণ। হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুঁড়ি’ বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে। বঙ্গবন্ধু যে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বারবার বলে গিয়েছিলেন, আজ আমরা সেই মুক্তি অর্জনের পথে। এই এগিয়ে চলায় বাংলা ও বাঙালিকে উদ্দীপিত করেছে বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল জীবন, ইতিহাস ও আদর্শ। যিনি তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতিকে লড়াই করার মন্ত্র ‘জয় বাংলা’ দিয়ে গেছেন। এই মন্ত্র যতোদিন আমরা আঁকড়ে থাকতে পারবো, ততোদিন বাংলাদেশ পথ হারাবে না। দুরন্ত দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলবে বাংলাদেশ।
লেখক: গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Post a Comment

0 Comments