বালুতে ডুবে গেছে অর্ধশতাধিক বাড়িঘর

চেতনায় কুষ্টিয়া প্রতিবেদক ॥ কথা ছিল পাকা বাড়ির সামনে দিয়ে বাঁধ তৈরি করে বালু ফেলা হবে, যাতে কারও কোনো সমস্যা না হয়। কিন্তু করা হয়েছে উল্টো। রাতের অন্ধকারে যখন সবাই দেখল প্রতিটি ঘরের চারপাশে বালু ভরাট হয়ে আসছে, ঘরের চাল সমান করে ফেলা হয়েছে বালু, তখন সবকিছু রেখে কোনোরকম দৌড়ে বাঁচেন সবাই। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতবাক ও স্তব্ধ!
এমন ঘটনা ঘটেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের বহলা গোবিন্দপুর এলাকায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের এই পরিকল্পনাহীন কর্মকাণ্ডে বালুতে ডুবে গেছে প্রায় ৫০টি বাড়িঘর। এতে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য এলাকায় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে দেড় শতাধিক পরিবার।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওই এলাকার প্রায় ৫০টি কাঁচা-পাকা বাড়ির ঘরের চালা সমান করে বালু ফেলা হয়েছে। বালুতে তলিয়ে গেছে টিউবওয়েল, বাথরুম, রান্নাঘরসহ সবকিছু। অনেক পরিবারে রান্না হাঁড়ি চড়েনি। তারা না খেয়ে আছেন। রান্না কারার আর কোনো জায়গায়ও নেই।
ভুক্তভোগী পারিবার ও স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) খাল খননের জন্য খালের তীরবর্তী সব জলাশয় ভরাট করার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল পাউবো। বালু দিয়ে জলাশয় ভরাটের শুরুতে পাউবোর অধিগ্রহণ করা সম্পত্তির ওপর প্রথমে বালু ফেলা হয়। পরে বহলা গোবিন্দপুর গ্রামের প্রায় ৫০টি বসতবাড়ির ভেতরে বালু ফেলা শুরু করে। এতে ঘরের চাল পর্যন্ত বালু দিয়ে ভরাট হয়ে যায়। ফলে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে বসতবাড়িগুলো। রাতের আঁধারে দ্রুত বালু ফেলায় সবাই আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর ফেলে অন্যত্র চলে যায়। এলাকাবাসী নিষেধ করলেও মানা হয়নি তা। এভাবে চলতে থাকলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা যায়, বর্তমানে যে জায়গাটি বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, তা একসময় ছিল মালিকাধীন জায়গা। সরকারি খাল খননের জন্য সেই জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। এতে সেখানে বসবাসরত পরিবারগুলো বাড়িঘর ভেঙে চলে আসে গড়াই নদের পাশে। শুরু হয় নতুন করে বসবাস। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নদীতে বিলীন হয়ে যায় তাদের সেই আশ্রয়স্থল। কোনো উপায় না পেয়ে অসহায় পরিবারগুলো পুনরায় বসবাস শুরু করে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) খালের অধিগ্রহণকৃত জায়গায়। পরে এখানে কোনো রকম বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছিল তারা। কিন্তু সম্প্রতি কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে গড়াই নদ খনন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তার স্বার্থ হাসিলের কারণে বাড়িছাড়া হয়েছে ওই অঞ্চলের শতাধিক পরিবার।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী হোসেন আলী বলেন, বহলা গোবিন্দপুর এলাকায় জিকে খাল খননের জন্য খালের তীরবর্তী সব জলাশয় ভরাট করার প্রকল্প হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। শুরুতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণ করা সম্পত্তির ওপর বালু ফেলা হয়। পরে বসতবাড়ির দিকে বালু ফেললে নিষেধ করা হয়। কিন্তু রাতের আঁধারে বালু ফেললে বহলা গোবিন্দপুর গ্রামের প্রায় ৫০টি বসতবাড়ির ঘরের চাল পর্যন্ত বালু ভরাট হয়ে যায়। এতে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আমাদের বসতবাড়িগুলো।
তিনি বলেন, রাতের আঁধারে দ্রুত বালু ফেলায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে কাঁচা বাড়িঘর ফেলে রেখে অন্যত্র চলে গেছেন। কেউ পার্শ্ববর্তী এলাকায় আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে গিয়েছেন। বাকিরা এই ভোগান্তির ভেতরে মানবেতরভাবে বসবাস করছেন। আমরা এই সমস্যার দ্রুত সমাধান চাই।
এলাকার গৃহবধূ সাবিনা বলেন, আমাদের আধাপাকা বাড়ি। দুটি বাড়িতে মোট চারটি ঘর। রান্নাঘর আলাদা। বালুতে আমাদের ঘরবাড়ি-রান্নাঘরের সবকিছু ডুইবে গেছে। আমরা খুব কষ্টে আছি। বাতাস হলে বালুতে টেকা চরম কষ্ট। রান্নাঘরও ডুবে গেছে। ঠিকমতো রান্না করতে পারছি নে। আমরা সবাই খুব ভোগান্তির মধ্যে আছি। কীভাবে আমরা ছাওয়াল-পাওয়াল (ছেলেমেয়ে) নিয়ে বাঁচব। আমাদের একটু সাহায্য করেন আপানারা। আমরা একটু বাঁচি।
ভুক্তভোগী এক বৃদ্ধ কান্না করতে করতে বলেন, আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিসারের কাছে খুব অনুনয়-বিনয় করলাম। এরপর তারা মানল না। আমাদের এইভাবে ডুবাই দিল। এই বিচার আপনাদের কাছে চাই। আমাদের আর কোনো দাবি নাই।
চাপড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মনির হোসেন রিন্টু বলেন, জিকের খাল খননের সময় পাড় বাঁধার জন্য ড্রেজার দিয়ে জলাশয় ভরাট করার কথা। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড খালের পাশে তাদের অধিগ্রহণ করা সম্পত্তি ছাড়াও জনগণের সম্পত্তির ওপর বসতবাড়িতে বালু ফেলেছে। এতে বহু মানুষ বাসস্থান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজিং শাখা) তাজমির হোসেন বলেন, আমরা নির্দেশ দিয়েছিলাম পুকুর ভরাট করতে। আপনার কাছ থেকে জানতে পারলাম যে বসতবাড়ির চালা পর্যন্ত বালু ভরাট করা হয়েছে। আমি স্বীকার করছি এটা অন্যায় ও অপরাধ। যে কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিল, অফিস খুললে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীবুল ইসলাম খান বলেন, বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। তারাই এ সমস্যার সমাধান করবে।

Post a Comment

0 Comments