ভালোবাসা ভালোনেই : লেখক আলী হাসান সনি

আজ ভালোবাসা দিবস। যে দিন থেকে শুনেছি সেদিন থেকেই জানি এটা বসন্তে হয়, শীতের আভাস কাটিয়ে গাছের পুরনো পাতা ঝরে পড়ে চারিদিকে, ভোর হলেই গাছের ডালে বসে ডাকতে থাকে দোয়েল। তবে এখন তেমন আর হয়না। বদলে গেছে আমাদের নিজদিগের কারণে। তবে হ্যাঁ কাক ডাকে কা কা। আমি ছোট বেলায় যার কাছে মনে হয় বেশী ভালোবাসা পেয়েছি তিনি হচ্ছেন আমার নানা আর নানি। ভোর বেলায় উঠে কাকের কা কা ডাক শুনলে তাদের বলতে শুনেছি, "হৈত! হৈত! যা, দুরে যা, গোয়াল বাড়ী যা; দুধ ভাত খা।" কেন যে বলতো তা কখনও জানতে চাইনি তাদের কাছ থেকে। এখন আমাদের সমাজে শুনতে পাই কাক নাকি দুঃসংবাদ দিতে এমন করে ডাকতে থাকে বাড়ীর কর্তাকে কাকা বলে। কবি, লেখক, শিল্পীর গানে শোনা যায় বসন্তে কোকিল ডাকে কুহ্ কুউহ্ কুউহ্ বলে। কাক কোকিল দুটোই আমাদের দেশীয় পাখি।  দুজনেই দেখতে কালো। তাদের কন্ঠে যে আওয়াজ বের হয় তা হচ্ছে নিজেদের প্রিয় জনকে কাছে ডাকার সুর বা শব্দ। তারা বসন্তের সময় একে অপরের সাথে মিলেমিশে প্রকৃতিতে নিজেদের সকল কাজ সম্পাদন করে থাকে যার সংক্ষিপ্ত হচ্ছে প্রজনন। পাঠক, আপনাকে আগেই বলে রাখি ভালোবাসার কিন্তু সর্বশেষ আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে ঐ প্রজনন। আমাদের আদম সভ্যতার বিকাশ হয়েছে হাওয়ার প্রজননে, তাই এটাকে খারাপ ভাবে নেবেন না। বসন্তের এই প্রথম প্রহরে বর্তমান পৃথিবীর সকল স্থানে বইতে থাকে বাতাস (হাওয়া), এমন মৃদু হাওয়া শরীরে লাগলে শিহরণ জাগে নব যৌবনে। তবে ভালোবাসা কিন্তু শুরু হয় ভালোলাগা থেকেই। ফেব্রুয়ারী মাসের চৌদ্দ তারিখে নির্ণয় হয়েছে ভালোবাসা দিবস।বাঙালীদের কাছে এর তেমন প্রচলন ছিলোনা। তবে আধুনিক সময়ে কোথাও বাদ নেই এর ধোঁয়া পৌঁছতে। তাই বছর পেরিয়ে আবার চলে এসেছে সেই মহান মহিমান্বিত বাণী  "ভালোবাসা"। ভালোবাসা কিন্তু সম্পর্ক ভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়। তবে এই দিন কে কেন্দ্র করে যে ভালোবাসা উদযাপন হয়, বিশেষ করে তা হচ্ছে কিশোর কিশোরীর প্রেম। সব কিছুই এখন বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। তাই প্রেমও এখন মূল্য সংযোজন করে গড়ে ওঠে। এক জনের একটাতে হয় না। এই প্রেম ভালোবাসায় হাতেগোনা দু'একটা বাদে সকলেই ক্ষতির মুখে পতিত হয়। অথচ ভালোবাসার ইংরেজি নাম (লাভ), বাংলা ভাষায় যার মানে মুনাফা। যেখানে যে বয়সের ছেলে মেয়েরা মন লাগিয়ে পড়াশুনা করে নিজেদের জীবনের উন্নতির পথে ধাবিত হবে সেখানে সেই সময় এই মিথ্যে (লাভের) ভালোবাসার জন্য সব চেয়ে দামী সময় অপচয় করে জীবনের পথ পরিবর্তন করে চলেছে অবিরাম। বিরক্ত হচ্ছেন? একটু দাঁড়ান, নিয়ে আসছি কেন ছুটে এই ভালোবাসার পিছু। ঐ যে কোকিল ডাকে কুউহ্; কাক ডাকে কা কা; তারাতো অন্য স্বরেও ডাকতে পারতো: চা চা চি চি। কিন্তু তা হয় না, কারণ প্রকৃতির দান কেউ কারো কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেনা। মানুষের বেলায়ও তেমনি এটা প্রকৃতির  অনন্য একটা দান, যার নাম "ভালোবাসা"। তবে কেন যেন দেখছি এখন এটা ভয়ানক একটা অসুখে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। খুব বেশি না, এইতো বছর কুড়ি আগের কথা বলতে চাচ্ছি; তখন আর এখন কত যে আলাদা হয়েছে তা বলার একটু চেষ্টা করছি, শুনুন। তখন মাধ্যমিক এর শেষ ভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এর প্রথমে আসতো বসন্তের দিন। আর এখন এক ধাপ আগে প্রাথমিকেই কারো কারো বসন্তের হাওয়ার অনুভব হয়। সে যাই হোক, ডাক আসলে তো যেতেই হবে যার যে সময় তার তখনই; মানে বলছিলাম যৌবন প্রাপ্তি হলেই যে তার ভালোবাসা প্রকাশ পায় তার কোন ভুল নেই। যে ভালোবাসার গল্প লিখতে গিয়ে এতো কথা বলে ফেললাম এবার হয়তো যিনি পড়ছেন এতো সময় ধরে তার মনে মনে রাগের সৃষ্টি হচ্ছে। হোক, ভালোবাসায় রাগ বিরাট একটা অংশ, যার কারণে ভালোবাসার মূল আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে।রাগ আমারও হয়েছে, যেদিন আমার সম্পাদক সাহেব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে তার পত্রিকায় লেখা আহ্বান জানিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। কেন বলি, বিজ্ঞাপন দেখে আমি এবার দারুণ একটা ভালোবাসার গল্পের সন্ধানে ভোর বেলায় উঠে শহরের বিভিন্ন গলি, গ্রামের রাস্তায় চলতে লাগলাম। নজরে আসলো কি শুনুন, চৌদ্দ পনেরো বছর বয়সের মেয়ের সাথে একটা আঠাশ ত্রিশের একদম ভরা যৌবনা নারী। এক জনকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। সকাল সকাল মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলো। আমায় দেখে এমন ভাবে হাতের ইশারা করলো, তাতে আমার যে কী অনুভব হলো তা আমি ব্যাক্ত করতে পারছিনা। তবে হ্যাঁ, চেষ্টা করছি একটু বলার; যদিও অনুভবের বর্ননা হয় না। একটি কিশোর তার প্রেমিকার নিকটে প্রস্তাব পেশ করে মন বিনিময়ের সম্মতি জ্ঞাপন করার পর তাদের যখন একান্ত সাক্ষাৎ হয়, যেখানে আর কেউ থাকেনা, সেই মধুময় সময়ের উপলব্ধি আমিও পেলাম। আমি ফিরে এলাম আমার সেই চেনা মানুষটার এক ইশারায়। এসে দেখি মেয়েটা তার সাথে আর নেই, ঢুকে পড়েছে কোচিং সেন্টারের কক্ষে। আমি জানতে চাইলাম, "আপনি কেন এই সাত সকালে এখানে?" জবাবে বললো, "আর কেন? মেয়ের লেখাপড়ার খবর নাই, এই বয়সেই প্রেমে পড়ে গেছে। তাই সাথে নিয়ে আসি আর নিয়ে যাই, যেন প্রাইভেট রেখে কোথাও গা না ভাসায়।"   আমার রাগ এখানেই। এমন গাইড দিয়ে রাখলে যখন সুযোগ পাবে তখন প্রেমে আর কোন দিক থাকবে না। সোজাসু্জি ধাবিত হবে, ঐযে প্রথমে বলেছি, প্রজননের হাওয়াই। "ভালোবাসা ভালো নয়" একথা যেমন বলে সবাই, ঠিক তার সাথে ভালোবাসেনি এমন কোন একটি আদমও নাই। আজ ভালোবাসার গায়ে ছায়া পড়ে গেছে, "ভালোবাসা" ভালো নেই।

Post a Comment

0 Comments