কুয়াশায় ঘেরা : লেখক আমেনা খানম

নানীমা আর কতদিন সময়  লাগবে, মামনি  ফিরতে?আর ভাল লাগছে না!বাবাওতো কতদিন হয়ে গেল আসছে না!এরকম প্রতিদিনই হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় রিজিয়া বেগমের। দীর্ঘ সতেরো বছর পর গর্ভে এসেছিল শাকিলা।কি সুন্দর  রূপ ছিল  তার,আরো গুণ। খুব  প্রয়োজন  ছাড়া অপ্রয়জনীয় কোন কথা কখনোই  শাকিলা বলতো না।উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া অবস্থাতেই বিভিন্ন  ঘর থেকে বিয়ের ভাল ভাল সম্বন্ধ আসতে লাগল তার।এদিকে মনেমনে তার বিয়ের  পাত্র ঠিকই  করা ছিল  প্রায়।শুধু তার প্রতিষ্ঠিত হবার সময়ের অপেক্ষায়  দিন গুনছিল শাকিলার বাবা কামাল মাষ্টার। তিনি সরকারি  বালিকা  উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে  আছেন। আর বছর চারেক আছে চাকুরীর মেয়াদ।তারপরতো অবসর।
শাকিলা লেখাপড়ায়  বেশ ভাল তবুও  বাবার মতামতই তার মতামত।তাই অনেক কিছু বুঝেও অবুঝ থাকতে হচ্ছে।দেখতে দেখতে শাকিলাও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে গেল।এবার তার বাবা তার বিয়ের ব্যাপারে তার মায়ের সাথে আলাপচারিতায় প্রায় সব কিছুই  শাকিলা শুনে ফেলল।পাত্র তার বাবার ছাত্র  হাবিবুর রহমান।বেশ কয়েকবার এ বাসাতে এসেছেনও।তিনি সরকারি  বড় চাকুরী  পেয়েছেন  এ পযর্ন্তই শাকিলা জানতে পারে।এর চেয়ে বেশি জানার আগ্রহও  খুব  একটা নেই তার!বাবার উপরেই সব কিছু ছেড়ে  দিয়েছে।যা ভাল বুঝে  বড়রাই করবেন!
খুব  একটা  ঘটা করে শাকিলার বিয়ে হয়নি।একদিন সন্ধ্যায় বেশ সাত আটজন মানুষ ও শাকিলার বাবা মার খুব  কাছের পনেরো বিশজন মানুষের  উপস্থিতিতে  শাকিলার বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ  হয়।কিন্তু কেন জানি শাকিলার প্রথম  থেকেই  মনে হয়েছিল  তার স্বামী  হাবিবুর রহমান  তার নিজ ইচ্ছেতে বিয়েটা করেনি।হয়ত তার বাবার কাছে তার স্বামীর  অনেক ঋণ ছিল!আর এই বোধ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে  কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে উদ্ধার করলে কিছুটা হালকা হওয়া যাবে ভেবেই বিয়েতে আর আপত্তি  করেননি।কিন্তু ভালোবাসা  কী আর ছলনায় ভোলে!
দেখতে দেখতে শাকিলার বিয়ের বয়স ছয় বছর হতে চলল। এরই মধ্েয শাকিলা আবার প্রাইভেটে বি.এ ভর্তি হয়েছে।লেখাপড়ায়ও আর মন বসছে না।শুধু পাওয়া না পাওয়ার হিসেবে নিজেকে  ব্যস্ত রাখছে অনিচ্ছাকৃতভাবে!শাকিলা সময় পেলেই আকাশ দেখে।চমৎকার নীল আকাশ! কিন্তু  রৌদ্রময় আকাশও যে আর ভাল লাগে না।বরঞ্চ আকাশে মেঘের আনাগোনাই বেশ লাগে।গান গাইতে ইচ্ছে হয়।বৃষ্টিভাল লাগতো না কিন্তু  বৃষ্টির সাথে নিজেকেও ভিজিয়ে  নেয়। আকাশের সাথে শাকিলাও ইচ্ছেমত কাঁদে!করুণ আর্তনাদ কারো হৃদয়  ছোঁয়া  পায় না!চৈত্রের খড়তাপের মত বুকের জমিনটাও যে ফেটে চৌচির  হয়ে গেছে।সে খোঁজ  যে কেউ  কোনদিনও  রাখেনি!বাগানে ফুলে ফুলে ভরে আছে কিন্তু যত্নের জন্য  তো একজন মালির দরকার ছিল!শাকিলা ভাবে এসব প্রেম ভালোবাসা সব উপন্যাস আর নাটকেই সম্ভব।বাস্তবতা যে কতটা নিষ্ঠুর!সে কথা শাকিলাদের মত বহু শাকিলারা তাদের শাড়ির  আঁচলের ভাঁজে অনেক যত্নে লুকিয়ে রাখে এতটুকু  অযত্নও যেন না হয়!
যতই  ভালোবাসা  দিয়ে  জড়াতে চাক না কেন ভালোবাসা তো আপনা আপনিই হয়!কিন্তু শাকিলা দিনে দিনে বেশ বুঝতে  পারছে এই সংসারে তার কোন জায়গা নেই।অযথাই যেন জায়গা  দখল করে আছে সে!এই যাতনা কার কাছে বলবে!বিয়ের পরে স্বামীই যদি সব হয় তাহলে তার তো সেই জায়গাটুকুও শূন্য!কী করবে কোথায় যাবে কিছুই  বুঝতে পারছে না!
আর দশটা সাধারণ  স্বামী  স্ত্রীর  মতো সম্পর্ক তখনো তাদের মধ্েয হয়ে ওঠেনি।সংসারের প্রথম দিন থেকেই দুজনের মন এক হতে পারে নি।আর এই সীমারেখা  অতিক্রম  না করার হুমকি দিয়েছিলেন তার উচ্চ শিক্ষিত ডিগ্রীধারী স্বামী  হাবিবুর  রহমান।
কেন কথাটিও বলা ছিল বারণ।তারতো একটাই কথা তোমাকে  আমার  পাশে মানায়?ভেবেছ কি কখনো? লেখাপড়াওতো শেখনী তেমন তাহলে----
শাকিলা থাকত  নিরুত্তর!এই লোভ কি আমি করেছিলাম!
বাবামার বাধ্য সন্তান হিসেবেত আমার অনেক বেশি  সুখি হবার কথা ছিল।কিন্তু যা হচ্ছে এর জন্য কারা দায়ী?
এরপর বাঙালি  ধ্যান ধারণায় শাকিলাকে বন্দি করা হল। বিয়ের সাত বছর হতে চলল অথচ সন্তানাদি হবার নামই নেই!নিশ্চয় মেয়ে মানুষটারই দোষ!চলল বিভিন্ন  ঝাড়ফুক,তাবিজ কবজেরও কমতি রাখল না।তাতেও কাজ হল না।এবার বিচার শালিস বসানো হল শাকিলার বাবার বাড়ীতে।একজন বাবা কতটা অসহায় হলে অন্েযর পা জড়িয়ে  ধরে তার মেয়ের সংসার বাঁচানোর জন্য তা আশাকরি  সবারই বোধগম্য!তবুও কিছু নামধারী মুখোশধারী মানুষেরা নিজেস্ব স্বার্থ হাসিলের  জন্য কখনও কখনও  মানুষের  রূপ  ধারণ করে!
বিয়ের আগেই হাবিবুর রহমানের প্রেম ছিল।কিন্তু প্রায় মোটা অঙ্কের  টাকা লেখাপড়া  আর চাকুরীর জন্য কামাল মাস্টারের কাছ থেকে ধার নিয়েছিল  হাবিবুর  রহমানের মা।ছোটবেলাতেই হাবিবুর  রহমানের পিতা মারা যান। তাই পিতৃহীন সন্তানকে মানুষের  মত মানুষ  বানাতে কত জনের দরজায়  না টোকা দিতে হয়েছিল  হাবিবুর  রহমানের  মাকে!তখন একমাত্র  এই কামাল মাস্টার  নিজ সন্তান  ভেবে তার সর্বস্ব দিয়েও তার মে জামাই হাবিবুর রহমানের  পাশে ঢাল হয়ে দাড়িয়েছিলেন।আজ এই দিনটি দেখবে বলে?এত কিছুতেও শাকিলা নিরুত্তর!তার মনতো কবেই মরে গিয়েছিল  এখন শুধু তার দেহের মৃত্যুর  অপেক্ষায়!
হাবিবুর  রহমান তার স্ত্রী শাকিলাকে বলে তুমি  কেমন ধরনের মেয়ে মানুষ  আমি বুঝি  না।আমিতো ভেবেছিলাম  তুমি  চলে যাবে কিন্তু  সেই আমার  জীবনটা বসে বসে নষ্ট করার ছক আটলে কেন?কথার জবাব দাও।এবার শাকিলা বলল,যে স্বামী  তার স্ত্রীর মুখের কোন কথা শোনার ইচ্ছা রাখেনি,কাছে রাখেনি,সুখ দুঃখের সঙ্গী  ভাবেনি  সেই স্ত্রী  কী আর করতে পারে!আজ আমারও  একটা কথা বলার আছে, শুনবে!কাল পবিত্র লাইলাতুল বরাত আমার  সাথে নামাজ  আদায় করবে!
এইটুকুই আর কিছু বলার নেই!সব ইচ্ছেগুলিকে একে একে ছুটি দিয়ে দিয়েছি।আর অল্প কিছু ইচ্ছেরা আছে তাও খুব  অনিচ্ছাতে!
যথাসময়ে  দুজন  একসাথে  নামাজ  আদায় করল।কার মনের বাসনা কী ছিল তা একমাত্র বিধাতায় জানতো!মাস তিনেকের মাথায় হঠাৎ  করে শাকিলার শরীরটা খারাপ করছে।কিছুই ভাল লাগছে না।আগের চাইতে হাবিবুর  রহমান অনেকটাই শাকিলার প্রতি দূর্বলতা অনুভব  করছেন কিন্তু  শাকিলা,  সে যেন তার ভবিষ্যত  নিজ চোখে দেখতে পারছে!
বিধাতা যদি চায়  তাহলে পাথরেও ফুল ফোটাতে পারেন!শাকিলাও সন্তান  সম্ভাবা।হাবিবুর রহমান অবাক যতখানি  হয়েছেন তার চেয়ে খুশিই বেশি হয়েছেন! এভাবে বছর চারেক তাদের সংসার জীবন তাদের একমাত্র  মেয়ে সৃষ্টিকে নিয়ে খুব  আনন্দেই  কাটতে লাগল।কিন্তু বিধি  হল বাম।শাকিলার সংসারে আবার ঝড়ের পূর্বাভাস।আবার কেন জানি শাকিলার মনে হচ্ছে এবারের ঝড়ে সব ভেঙ্গে  খানখান হয়ে যাবে!তাই হতে চলেছে।সেদিন মনের ঝড়ের সাথে একতা  ঘোষণা  করেছে প্রকৃতিও!হাবিবুর রহমান  অফিসের কাজের ছুঁতোয় পুরোনো  প্রেমিকাকে নিয়ে অভিসারের  আয়োজন  করেছিলেন। যা হয় সত্যকে চাপা দেয়ার মত শক্তি কারোই নেই।শাকিলাও যেন নিজ সংসারের অধিকার  সম্পর্কে  অনেক সচেতন  হয়ে উঠেছে।নিজের লেখাপড়াও শেষ করেছিল।নিজেকে যোগ্য  স্ত্রীর  মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত  হতে যা করা লাগে।সব গুনেই সে এখন অনন্যা।সন্তান ছিল না তাও আল্লাহ্  দান করেছেন।তাহলে কীজন্েয তার সংসারে সুখগুলি ক্ষণস্থায়ী হবে?
চোরা শোনে না ধর্মের কাহিনী!হাবিবুর রহমান তার স্ত্রীর  এই রূপ  মেনে নিতে পারেন নি!আর তাই হাতের কাছে রাখা ফুলদানি দিয়ে  চিরতরে শাকিলাকে স্তব্দ করে দিয়েছিল!কিন্তু সকলের কাছে নিজেকে নিরপরাধ  সাজাতে একটার পর একটা প্রেক্ষাপট  সাজাতে সে ছিল তীক্ষ্ম!আর তাই শ্বশুরের কাছে তার সন্তানের  ভবিষ্যতের  ভাবনার দায়ভার  চাপিয়ে নিজেকে মুক্ত রাখার আবদার জানাল। অভিমানি পিতা তার সন্তান হারানোর শোক আবার মাসুম শিশু সৃষ্টির মুখপানে তাকিয়ে কোন আইনি ঝামেলায় জড়ালেন না!বাধ্য হয়ে জানালেন যে তার মেয়ে শাকিলা ছিল মানসিক ভারসাম্যহীণ!হায়রে জীবণ!আর কতখানি ধৈর্য্য  ধারণ করলে তুমি  সুখ হয়ে ধরা দিবে??
আজ শাকিলার দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার নয়মাস একুশ দিন!
আর কতদিন পরে মামনি আসবে!সৃষ্টিকে কী দিয়ে বুঝাবে তার নানা নানীমা  বুঝে পায় না!এরই মধ্েয হাবিবুর  রহমান পেছন থেকে সৃষ্টির  চোখ ধরে -- তোমার  জন্য দেখো তোমার  মামনিকে নিয়ে আসলাম!এবার খুশিতো!আমার মামনি,আমার মামনিতো রোজ রাতে আমায় ঘুম পাড়িয়ে যায়!সারারাত আমার  কাছেই থাকে!ভোর হলেই সূর্য হয়ে যায়!

Post a Comment

0 Comments