কুষ্টিয়া ৪৬ কিলোমিটার এলাকা বিস্তৃত জুড়ে ভারতীয় সীমান্ত ॥ ৬ মাসে ১৭ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার

চেতনায় কুষ্টিয়া প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ৪৬ কিলোমিটার এলাকা বিস্তৃত জুড়ে ভারতীয় সীমান্ত। এর মধ্যে ১৮ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া। বাকি ২৮ কিলোমিটার ‘অরক্ষিত’ উন্মুক্ত। সীমান্তের ২৮ কিলোমিটার অরক্ষিত-উন্মুক্ত জায়গা দিয়েই প্রতিদিন পানির মতো আসছে মাদক। গত বছরের ৬ মে কুষ্টিয়া স্টেডিয়ামে জেলার ২২২ জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক পাচারকারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এদের মধ্যে দৌলতপুর সীমান্তের রয়েছে ১১৭ জন মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণের পরও থেমে নেই দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার। ভারত থেকে অবাধে আসছে ফেনসিডিল, গাঁজা ও মদ। মাঝে মাঝে বিজিবি’র অভিযানে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা কিছু মাদক উদ্ধার করা হয়। মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের পর মাদক ব্যবসা বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবাধে মাদক পাচার করছে। তবে পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বিজিবি’র হাতে কোন মাদক ব্যবসায়ী বা পাচারকারী আটক হয়নি।
সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলার ধর্মদহ, প্রাগপুর, বিলগাথুয়া, জামালপুর, মহিষকুন্ডি মাঠপাড়া, মুন্সিগঞ্জ, চল্লিশপাড়া, চরপাড়া, চিলমারী, চরচিলমারী, উদয়নগর, ডিগ্রিরচরসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মাদক পাচারকারীরা গোপনে বিভিন্ন কৌশলে ফেনসিডিল, গাঁজা ও মদসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার করছে। আর এসব মাদক হাত বদল হয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কুষ্টিয়া ৪৭ ব্যাটালিয়ন সুত্রে জানা যায়, গত ৬ মাসে (আগষ্ট-২০২০ থেকে জানুয়ারী ২০২১) পর্যন্ত কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে ১৬কোটি ৬৭ লাখ ৮৫ হাজার ৬শ ৮৫ টাকার মাদক উদ্ধার করে বিজিবি। উদ্ধার করা মাদকের মধ্যে হলো ২ কেজি ৫৫ গ্রাম হেরোইন, ২৯ হাজার ২৬৮ বোতল ফেনসিডিল, ৩৯ হাজার ৩৮০ বোতল মদ, ৫১ হাজার ২৪১ পিস্ ইয়াবা ট্যাবলেট এবং ৩৮৭ কেজি গাজা ও ৫৮ হাজার ৫৬৫ প্যাকেট বিড়ি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মাদকের চালান ঢুকছে দেশে। এতে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছি। প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী ও রাষ্ট্র আন্তরিক না হলে শুধু বিজিবি, পুলিশ ও রর্‌্যাবের পক্ষে মাদক পাচার রোধ কঠিন।’
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন সংস্থা দৌলতপুর উপজেলার সভাপতি সাকিম উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে ভারত থেকে মাদক পাচার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে।শুধু বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর প্রচেষ্টায় মাদক পাচার রোধ করা কঠিন। যেহেতু ভারত থেকে মাদক আসছে, তাই সেদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কুষ্টিয়ার মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র ফেরার চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন বলেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা প্রদানের অভিজ্ঞতা এবং ঐ সমস্ত এলাকায় মাদকবিরোধী প্রচারনাকালীন সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি যে ঐ অঞ্চলের সকল মাদকব্যবসায়ী.চোরাকারবারীই যে মাদকাসক্ত তা কিন্তু নয় । অনেকেই আছে যারা মাদকাসক্ত নয়, তারা এই মাদকব্যবসা, চোরাকারবার কে অন্যান্য পেশা বা ব্যবসার মতো ভাবে। তাছাড়া এক্ষেত্রে খুব সহজেই অনেক বেশি লাভ করতে পারে। অন্যদিকে যে সমস্ত মাদকাসক্ত মাদকব্যবসায়ী, চোরাকারবারী আছে তারা এই ব্যবসা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারে না কারণ, ব্যবসা ছাড়লেও তারা মাদকসংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে যাতে পারবে না মাদক গ্রহণের কারণে। এই সমস্ত অঞ্চলে সার্বিকভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করত হলে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ যেমন উদ্বুদ্ধকরণ, আইনের প্রয়োগ, কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা, মাদকাসক্তি চিকিৎসা, নিয়মিত তদারকিকরণও জোর দিয়ে করতে হবে বলেও জানান তিনি ।    
কুষ্টিয়া জেলা সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)'র সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রফিকুল আলম টুকু বলেন, ভারতীয় সীমান্তে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ৪৬ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ২৮ কিলোমিটার অরক্ষিত-উন্মুক্ত জায়গা দিয়েই প্রতিদিন পানির মতো চলে আসছে মাদক। অথচ যে পরিমান বিজিবি মোতায়েন করা দরকার লোকবলের অভাবে তা সম্ভব না হওয়ায় মাদক চোরাচালান থামানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এছাড়াও এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও জনপ্রতিনিধিরাও এই মাদক পাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকায় মাদক চোরাচালান থামানো যাচ্ছে না।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কুষ্টিয়া ৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল ফরহাদ হারুন চৌধুরী জানান, ভারতীয় সীমান্তে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ৪৬ কিলোমিটার এলাকা বিস্তৃত। এর মধ্যে ১৮ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া। বাকি ২৮ কিলোমিটার ‘অরক্ষিত’ উন্মুক্ত। সীমান্তের ২৮ কিলোমিটার অরক্ষিত-উন্মুক্ত জায়গা দিয়েই মাঝে মাঝে মাদক আসে। আমরা প্রতিনিয়ত এই মাদক উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করে থাকি। গেলো ৬ মাসে দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে আসা প্রায় ১৭ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। বিজিবির সদস্যরা নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করায় তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব মাদক চলে আসে। অনেক সময় রাতের আঁধারে চোরাচালানীরা মাদক নিয়ে আসে মুখ বেঁধে এছাড়াও বিজিবি সদস্য দেখে চোরাচালানীকারীরা পালিয়ে যান। আমরা আসামিদের ধরার চেষ্টা করি। তবে  স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সচেতনমহলসহ সকলকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাদক চোরাচালানে প্রতিরোধ করতে হবে।

Post a Comment

0 Comments