গন্তব্য : লেখক কানিজ ফাতেমা, সিঙ্গাপুর।

রেলব্রিজের ধার ঘেসে যাওয়া বাগানে বসে দীপা ও অয়ন সাথে আরও অনেকেই অস্থির হয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে মধ্য রাতের ট্রেনের জন্য। কাল রাতেও দীপা ভাবেনি তাকে এভাবে এখানে অয়নের সাথে ট্রেনের অপেক্ষায় এতটা অস্থির হয়ে বসে থাকতে হবে। গতকাল রাতের কথা- বিয়ের পর অয়নের সাথে এই প্রথম ঢাকা যাচ্ছিল দীপা, তাও আবার মধ্য রাতের ট্রেনে করে। বাড়ির সবার বিশেষ করে দীপার বাবা আজাহার ইসলামের তার এই বাড়াবাড়ি রকমের যাওয়ার আগ্রহ দেখে খুব বিরক্ত লাগলেও মা আসমা আক্তার তেমন কিছু বলল না। এদিকে দীপার মধ্যে প্রচন্ড রোমান্স ও উচ্ছ্বাস কাজ করছে এটা ভেবে যে এই প্রথম অয়নের সাথে পরিবার পরিজন ছাড়া একেবারে একা কোথাও যাচ্ছে সে একেবারে সিনেমার মত। আর রাতের বেলা কোথাও যাবে ভেবে সবকিছু কেমন যেন রহস্যময় গল্পের মত মনে হচ্ছিল তার। দীপা তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান- মফস্বল শহরে বেড়ে উঠা বিশ বছর বয়সের কলেজে পড়া মেয়ে। তিন মাস হলো অয়নের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। একটি বেসরকারি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বেশ ভালো পজিশনে চাকরি করে অয়ন, আর তার চেয়ে বড় কথা দেখতে ও কথাবার্তায় চমৎকার একজন মানুষ। ঠিক দীপার মনের মত, স্বামী হিসেবে যেমন একজনকে কল্পনায় চেয়েছিল ঠিক তেমন। আর দীপা প্রচন্ড চঞ্চল মিষ্টি চেহারার মেয়ে যে জীবনটাকে নিয়ে কখনো সিরিয়াস ভাবে ভাবে না। তার কাছে জীবন মানেই উপন্যাসের এক একটা চরিত্র। অয়ন এবার মুলত দীপাকে তাকেই সাথে করে ঢাকায় তার নতুন বাসাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিল। চারদিনের ছুটি নিয়ে দীপাদের বাড়ি এসেই ঝামেলায় পড়ে গেল সে। কি এক কারণে দূরপাল্লার গাড়িগুলোসহ সকল যানবাহনের লাগাতার অবরোধ শুরু হয়েছে। আর এই অবরোধের মধ্যে পড়ে একরকম বিপদেই পড়ে গিয়েছে অয়ন, কারণ অফিস খোলা আর তাকে আজকের মধ্যে ফিরে যেতেই হবে- তারপর কাল থেকে অফিসে যোগ দিতে হবে। এদিকে যেহেতু অফিসে ছুটিও শেষ আর অয়নকে কাল সকালের মধ্যেই হবে ঢাকায় পৌঁছতে হবে তাই এই অবরোধের মধ্যে ট্রেনই ভরসা দূরের পারে যাতায়াতের জন্য। আর দীপাদের এলাকা থেকে সরাসরি ঢাকা যাওয়ার একটাই ট্রেন- সেটাও আবার রাত সারে বারোটায়। অয়ন অনেক ভেবে অফিসে কথা বলে শেষমেশ ট্রেনের টিকেট কাটতে চাইলো। সে কারণে দীপার বাবা আজাহার ইসলাম পরিস্থিতি দেখে অয়নকে বুঝিয়ে বলল- বাবা এবার এই অবরোধের মধ্যে দীপার আর তোমার সাথে ঢাকা যাওয়ার দরকার নাই। এবার বরং তুমি একাই রাতের ট্রেনে চলে যাও। অবরোধ উঠে যাওয়ার পর আমিই না হয় দীপা কে ঢাকায় রেখে আসবোকি বলো? অয়নের যদিও দীপাকে সাথে করে নিয়ে যেতে খুব ইচ্ছে করছে তবুও পরিস্থিতি বুঝে ও শ^শুরের কথা শুনে আর কিছু বলল না। বরং নিজে যাওয়ার জন্য ট্রেনের একটা টিকেট করে নিয়ে ২ আসলো। কিন্তু দীপা নাছোড়বান্দা কারণ অয়ন ট্রেনে করে ঢাকা যাচ্ছে আর তারও ট্রেনে করে ঢাকা যাওয়ার খুব শখ। তাছাড়া তাদের বিয়ের পর এই প্রথম ভালোবাসা দিবস আসছে সেটাও আবার আগামীকাল। আর সে এই দিনটি অয়নের সাথেই কাটাতে চেয়েছিল। তাই বাবা-মা অয়নের সাথে এই মাঝ রাতে তাকে পাঠাতে অমত করলেও দীপার প্রচন্ড আগ্রহের কারণে অয়ন অনেকটা বাধ্য হয়েই দীপার বাবাকে বোঝালো যে সে আছে তাই কোন সমস্যা হবে না। তারপর বহু কষ্টে আরও একটি ট্রেনের টিকেট জোগাড় করে নিয়ে আসলো। এদিকে দীপার অয়নের সাথেই যেতে হবে, মেয়ের এমন আদিখ্যেতা দেখে তার বাবা মোটামুটি বিরক্ত হলেও মা ঠিকই বুঝলেন। আগ বাড়িয়ে আজাহার ইসলামকে বোঝালেন- দেখেন মেয়ে বিয়ের পর জামাইয়ের দায়িত্বে চলে যায়। তখন জামাইয়ের সাথে মনের মিল করে চললেই সংসারে সুখ আসে। দীপার যখন এবারই তার স্বামীর সাথে নিজের বাসায় যাওয়ার ইচ্ছা তখন আপনি আর আপত্তি করবেন না। জামাই মেয়ের মধ্যে মনের মিল থাকলেই তো আমরা খুশি, তাই না? তারপর রাত বারোটায় দীপার বাবা-মা তাদের সাথে স্টেশনে এসে সব গুছিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে বিদায় দিলেন। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার সময় দীপার বাবা-মাকে রেখে যেতে কেমন যেন কান্না পেতে লাগল। আয়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল কি মন খারাপ লাগছে? দীপা চুপ করে বসে রইলো। তার মানে দীপার আমার সাথে যেতে ইচ্ছে করছে না। কে বলল করছে না? বাবা-মা ছাড়াতো কখনো কোথাও যাইনি। আজ তোমার জন্য চলে আসলাম, তাই এখন মন খারাপ লাগছে। অয়ন দীপার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বেশ হাসি মুখ করে বলল আর কদিন পরে বাবা-মাকে বাসায় চলে আসতে বলবো। তারপর তুমি তাদের নিয়ে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াবেঠিক আছে? এবার দীপার অয়নের কথা শুনে ভালো লাগলো। দীপা খুব খুশি মনে বলে উঠলো- হুম বাসায় পৌঁছেই বাবাকে ফোন করে বলব ঢাকায় চলে আসতে, ঠিকা আছে না? অয়ন হেসে বলল খুব ঠিক আছে । বেশ কিছু সময় ধরে ট্রেন চলছে। ট্রেনে উঠার আগ পর্যন্ত দীপার মধ্যে যে পরিমান রোমাঞ্চ খেলা করছিল এখন আর তার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই, এখন কেমন যেন ভয় করছে তার। চারিদিকে অপরিচিত মানুষ তাছাড়া বেশ ভিড়, অবরোধের কারণে সবাই ট্রেনে চড়ে বসেছে আজ। রাতের ট্রেনের লাইটের টিমটিমে আলোতে দীপার কাছে কিছু কিছু মানুষের মুখ কেমন যেন অন্যরকম রহস্যময় মনে হচ্ছে। বেশিরভাগ পুরুষ যাত্রীর চেহারায় কেমন অপরাধীদের মত লাগছে। ৩ আর কিছু লোকের চাহনি দেখলে কেমন যেন চোর চোর মনে হচ্ছে। যদিও বেশির ভাগই ভদ্রলোক তবুও তার কল্পনাশক্তি যাত্রীগুলোর চেহারার বর্ণনা এভাবেই করল। তবে এর মধ্যে আশার কথা হল বেশ কয়েকজন মহিলা যাত্রীও তাদের পরিবারের সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। আসলে সবার হয়তো একই সমস্যা অবরোধের কারণে অন্য কোনভাবে ঢাকা যাওয়া সম্ভব হয়নি তাই হয়তো ট্রেনে করে যাচ্ছে। দীপা মনে মনে ভাবল ভালোই হয়েছে না হলে যদি কোন মহিলা এই ট্রেনে জার্নি না করতো তাহলে হয়তো তার ভয় আরও বেড়ে যেত। যাই হোক, দীপা আর অয়নের সিটের ঠিক অপর পাশের সিটটিতে একটি পরিবার যাচ্ছে। স্বামী, স্ত্রী ও তাদের ছোট ছোট দুটি জমজ ছেলে বাচ্চা- খুব সম্ভবত তিন চার বছর বয়সের হবে, দুজনেই বাবা-মার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে যত্নকরে তাদেরকে কোলের মধ্যে আগলে রেখেছে। সম্ভবত দীপাদের শহরের আগের স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়েছে। বাচ্চা দুটি মাঝে মাঝে ঘুম থেকে জেগে কান্না শুরু করছে আর তাদের বাবা-মা খুব কসরত করে দুজনকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্ট করছে, এখনও সেই চেষ্টাই অব্যাহত রয়েছে। দীপার চোখ বাচ্চা দুটির বিরক্ত হয়ে কান্না দেখার দিকেই বেশী মনোযোগী হয়ে রয়েছে আর বাচ্চার মা একটু পর পর অসহায়ভাবে দীপার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিচ্ছে। তার হাসি দেখে দীপার মনে হল বলতে চাইছে আপনাদের অসুবিধা হচ্ছে না তো? আর আর দীপা মনে মনে উত্তর দিল না আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। বরং বাচ্চা দুটি দেখে সে ভাবছে তাদের যখন বাচ্চা হবে তখন তারাও কি এভাবেই নিজেদের বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকবে- ভেবে কেমন যেন একটু লাজুক ভাবে হাসলো। অয়ন তাকে নিজ মনে হাসতে দেখে হাতে ঝাকুনি দিয়ে বলল- কি হল? কই কিছু না তো, দীপা হেসে উত্তর দিল। হাসছো যে? কই হাসছি না তো- বলে আবারও একটু হাসি খেলে গেল তার সারা চেহারা জুড়ে। হুম বলে হেসে অয়ন বাইরের দিকে চোখ ঘোরালো। ট্রেনের জানালাগুলো বেশির ভাগই ব›ধ করে রাখা হয়েছে আর কুয়াশার কারণে কাচগুলো ঘোলা হয়ে থাকাতে তেমন ভালো করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। একটা কাঁচ ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে যে একটু আধটু বোঝা যাচ্ছে তা হল বইরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো দৈত্যাকৃতির মনে হচ্ছে দীপার। কিছু বড় গাছকে বড় দৈত্য আর কিছু ছোট দৈত্য সবাই যেন মিছিল করে ট্রেনের সাথে এগিয়ে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর দুই পাশে কিছু বাড়ি আর ল্যাম্পস্টের সারিগুলো দেখে মনে হলো সামনে হয়তো আর একটি স্টেশন। দীপা অয়নকে জিজ্ঞাসা করল- সামনে কোন স্টেশন? বোধহয় কাজিহাটা জংশন- অয়ন উত্তর দিল। ৪ কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজিহাটা জংশনে ট্রেন এসে থামলো। সারা রাস্তার অন্ধকার পেরিয়ে এই স্টেশনে এসে মনে হচ্ছে যেন আলো ঝলমল করছে। অয়ন হেসে বলল- কেমন লাগছে? ট্রেনে চড়ার শখ পূরণ হল? দীপা অয়নের একটা হাত ধরে রেখে বলল ভালো। কিন্তু আসল কথা হল এই মধ্য রাতের ট্রেন জার্নিতে যে এতটা ভয় করবে তার সেটা আগে বুঝতে পারেনি সে, বুঝলে অয়নকেও আসতে দিত না। ছোটবেলার থেকে দীপার মনে হত ট্রেনে চড়তে কতই না মজা। সে কারণে ট্রেনে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ খুঁজত সে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের কোন আত্মীয় স্বজন কেউই এমন জায়গায় থাকতো না যেখানে ট্রেনে যাওয়া যায়। তাই কখনো কোথাও ট্রেনে চড়ে যাওয়া হয়নি তার। যাই হোক বিয়ের পর ভাবল নিজের বরের সাথে সেই ইচ্ছে পূরণ করা যাক। আর সেই শখে ট্রেনেতে উঠে বসেছে আজ। তবে একটু ভয় করলেও অয়নের হাত ধরে ট্রেনে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছে দীপার। কাজিহাটা স্টেশনটা জংশন হওয়াতে একটু বেশি সময় ধরে ট্রেনটা থেমে রয়েছে। আর কোন ট্রেন না থাকলেও নানা ধরনের লোকজন আসা যাওয়া ও ট্রেন থেকে উঠানামা করছে । স্টেশনটা এই রাতের বেলাতেও বেশ জমজমাট। হকাররা খাবার বিক্রি করছে নানা রকম জিনিসের কয়েকটি দোকান। দীপা অয়নকে জিজ্ঞেস করল আর কতক্ষণ লাগবে পৌছতে? তার কথা শুনে অয়ন হেসে বলে উঠলো-কি এটুকু এসেই অস্থির? এখনও অনেক সময় লাগবে। আচ্ছা তুমি কি ওয়াশরুমে যাবে? না যাব না। আচ্ছা তাহলে আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। না তুমি কেথাও যাবে না এখন তোমার বাইরে যাওয়া মানে হল সিগেরেট ধরানো। কোথাও যাওয়া লাগবে না আমার সাথে বসে থাক দীপা বেশ অধিকার নিয়ে অয়নকে তার পাশে বসিয়ে রাখলো। ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে এমন সময় নতুন বিয়ে হয়েছে এমন এক দম্পতি এসে তাদের সামনের সিটের এক পাশে বসল। নতুন বৌ বলার কারণ একটা লাল বিয়ের কাতান সাথে গহনা পরে বেশ সেজ গুঁজে এসেছে। আর এই মধ্য রাতের বেলা এমন সাজ দেওয়ার ধৈর্যএকমাত্র নতুন বৌদেরই থাকে। মেয়েটার বেশ মিষ্টি চেহারার দেখতে, খুব বেশি সতের আঠারো বয়স হবে। বরটা একেবারে শুকনা পাতলা গায়ের রং কালো সাথে লাল খয়েরী কালারের একটা গরদের পাঞ্জাবি পরে এসেছে। একেবারে খ্যাত বলা চলে, একবারে মানায়নি মেয়েটার সাথে। মেয়ের বাবা কি দেখে বিয়ে দিয়েছে কে জানে বলে দীপা তাদের দিকে তাকিয়ে ভালো কওে দেখতে লাগল। তবে তাদের দেখে তার খুব মজা লাগছে। অয়নের হাতে একটু চিমটির মত করে নতুন বর বৌ দেখতে ইশারা করল সে। অয়ন চোখ বুঁজে বসে ছিল তার চিমটি খেয়ে বিরক্ত হয়ে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে উঠলো- কি হয়েছে দীপা? ৫ দীপা তার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল- নতুন বর বৌ দ্যাখো- বলে একটু রহস্যের হাসি দিল। হুম হয়েছে, চুপ থাক, ও তুমি কিছু খাবে? আয়ন জিজ্ঞাসা করল। এই মাঝ রাতে? পাগল তুমি। আমি বুঝেছি বাইরে যাওয়ার মতলব চলছে তাই না? হবে না মশাই, চুপচাপ সিটে বসে ঘুমিয়ে থাকো বলে হাতটা চেপে ধরে রাখল দীপা। তার কথা শুনে আর হাত ধরে রাখা দেখে অয়ন হেসে ফেলল। এর মধ্যে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো। দীপা স্টেশনের দিকে তাকিয়ে দেখল এতক্ষণ যে হকারগুলো সমানে খাবার বিক্রি করছিল তারা পেছনে চলে যাচ্ছে আর ধীরে ধীরে ট্রেনটা সামনে এগোতে শুরু করেছে। স্টেশনের দোকানগুলো সহ আলোয় ভরা স্টেশনটা দ্রুত পেছনে যেতে শুরু করেছে। আবার সেই অন্ধকার বাইরে বেশ ঠান্ডা সে কারণে স্টেশনে যারা জানালাগুলো খুলে রেখেছিল তারা একে একে জানালা বন্ধ করতে শুরু করেছে। আরও অনেকের মত অয়নও সিটের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমানোর মত চোখ বুঁজে বসে রয়েছে। আর দীপা সামনে তার সামনে বসা নতুন বর বৌয়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তাদের একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে ইশারা করা দেখে মজা পাচ্ছে। বাচ্চাদুটিও এখন বেশ শান্ত ভাবে চিপসের প্যাকেটে মনোযোগ দিয়ে বসে রয়েছে। বেশ কিছু সময় ট্রেন চলছে এখন মনে হচ্ছে অনেক স্পিডেই চলছে, চাকার ঘটাং ঘটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। বগির মধ্যে সবার চোখেই ঘুম ঘুম ভাব কেউ কোন শব্দ করছে না ফলে কেমন যেন একটা স্তব্ধতা ঘিরে ধরেছে চারপাশে। এমন পরিবেশ দেখে তার কেমন যেন গা ছমছম করতে শুরু করেছে। আবার ভাঙা জানালার ফোকরে চোখ গেল দীপার রাতের আধারে বাইরের সবকিছু কেমন অদ্ভুত ভুতুরে লাগছে। অয়নের হাত শক্ত করে ধরে সিটে বসে সে চারপাশটা ভালো ভাবে লক্ষ করার চেষ্টা করছে। বোঝার চেষ্টা করছে বাইরের জায়গাগুলো তার চেনা কি না। এর মধ্যে সামনে বসা নতুন বরটা উঠে কোথায় যেন গেল। মেয়েটি একাই বসে রয়েছে তবে সে যে তার মত ভীতু নয় সেটা বোঝা যাচ্ছে। পাশের বাচ্চার মা এখন একটু স্থির হয়েছে কারণ বাচ্চারা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। নতুন বৌটিকে যেঁচে বাচ্চার মা জিজ্ঞেস করলো- নতুন বিয়ে হয়েছে? জি পরশু, আজ শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে সে। মেয়েটি এত সুন্দর হেসে উত্তর দিল তাতে দীপার বুঝতে অসুবিধা হল না যে মেয়েটি এ বিয়েতে খুব খুশি। সত্যি বিয়ে ব্যাপারটা অদ্ভুত অন্য একটা মানুষের জীবনের সাথে নিজের জীবন মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়া। আর সেই মানুষটা যদি মনের মত না হয় তাহলে হয়তো জীবনটা দোযখ হয়ে উঠে। সেই জীবনের অনুভূতি কেমন সেটা দীপার জানা হয়নি কারণ অয়নের মত স্বামী খুব ভাগ্য করে জন্ম নিলে পাওয়া যায়। মনে মনে ভাবছে কথাগুলো আর নিজে নিজেই ভালোলাগার অনুভূতির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে দীপা। অয়ন ঘুম, সামনের সিটে বসা ভাইটি তার বাচ্চাদের স্ত্রীর কাছে ঘুম পাড়িয়ে রেখে কোথায় যেন গেল- হয়তো ওয়াশ রুমে। ৬ সামনে বসা বাচ্চার মা এবার দীপার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো আপা আপনারও কি নতুন বিয়ে হয়েছে। হুম তবে তিন মাস হয়ে গেছে, হাসি মুখে দীপা বলল। মাত্র আমাদের তো সাত বছর- বলে হাসলো বাচ্চার মা। দীপা তাকে জিজ্ঞেস করল ঢাকায় কোথায় থাকেন আপু? জি উত্তরায় থাকি। আর আপনারা? আমি এই প্রথম বরের সাথে ঢাকা যাচ্ছি। ওর পল্লবীতে বাসা, দীপা বেশ হাসি মুখে উত্তর দিল।। ও আচ্ছা। কিছু মনে করবেন না আপা একটা কথা জিজ্ঞাসা করি? আপনাদের প্রেমের বিয়ে নাকি? না মানে যে সুন্দর করে ভাইয়ের হাতটা ধরে রেখেছেন। তার কথা শুনে একটু লজ্জা পেয়ে অয়নের হাতটা ছেড়ে দিয়ে দীপা বলল না আপু পারিবারিক ভাবেই ঠিক করে বিয়ে হয়েছে তবে বিয়ের আগে কথা হয়েছিল। কথাগুলো বলেই মনে মনে নিজেকে এত বোকা মনে হল একজন অপরিচিতার কাছে সব বলে দিল সে। এদিকে আপুটা আবার নতুন বৌটার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। কোন ক্লাসে পড়ে কয় ভাইবোন বাবা কি করেন একের পর এক প্রশ্ন করছে আর দীপা তার মনোযোগী শ্রোতা হয়ে সব শুনছে। বেশ কিছু সময় গল্প করতে করতে বাচ্চার মা বলে উঠলো- দেখেছেন আমার বরের কি আক্কেল, আমি দুইটাকে নিয়ে বসে রয়েছি আর সে কোথায় গিয়ে বসে রয়েছে। নিশ্চয় সিগারেট নিয়ে কোন কোনায় ধরাবার চেষ্টা করছে- বলে হাসলো। আমার জনও চেষ্টা করেছিল আপু তাই উঠতে দেইনি। এই ভালো বরদের একটু কড়া শাসনে না রাখলে কথা শুনতে চাই না বলে হাসল আপুটা। দীপাও হেসে তাল মিলিয়ে বলল একদম ঠিক বলেছেন আপু। হাসি আর কথার পিঠে আরও দু চারটি কথা হচ্ছে, এখন আর তেমন ভয় করছে না দীপার। এর মধ্যে হঠাৎ কেমন এক বিকট শব্দ করে ট্রেনটা একেবারে কাত হয়ে পড়ে যেতে লাগলো তারপর কেমন যেন থেমে গেল সব। দীপা শব্দ শুনে ভয়ে চিৎকার করে উঠল। অয়ন তার চিৎকার করা দেখে জেগে উঠে হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে থামানোর চেষ্টা করছে। দীপা এতটা ভয় পেল অথচ বচ্চা দুটি হাসছে ভেবে নিজেকে দেখে একেবারে বেকুব মনে হল তার। বাচ্চা মানুষ ভয় পাচ্ছে না আর সে কিনা ভয়ে মরে যাচ্ছে। বগির বাইরে থেকে কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে ট্রন পরে গেছে, কিন্তু বগির মধ্যে কারও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছু সময় পর সবাই একে একে বগি থেকে বের হয়ে যেতে লাগলো, দীপাকেও অয়ন বলল চল বাইরে যায়। ৭ বাইরে তো অন্ধকার, আমি যাবো না। ট্রেন কখন ঠিক হবে অয়ন? অয়ন দীপার প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। কথা ঘুড়িয়ে বাইরের দিকে হাত ইশারা করে বলল দেখ বাইরে কত আলো। সত্যি তো আলোয় ঝলমল করছে,কি সুন্দর একটা বাগানের মত সাজানো গোছানো এলাকা। দীপা দেখে উচ্ছ্বাসের সাথে বলে উঠলো- আচ্ছা সকাল হয়ে গেছে? আমিতো বুঝতেই পারিনি। আয়ন তার হাত ধরে বলল, চল দীপা । তাদের সামনে বসা নতুন বৌ আর বাচ্চার মা কে দীপা জিজ্ঞেস করল- বাইরে বের হবেন আপু? চলেন যাই, বাবুদের আব্বু কোথায় যে গেল? বেশ চিন্তিত চেহারা তার। এই নতুন বৌ তুমিও চল, এখানে একা বসে কি করবে? কিন্তু ও কোথায় গেছে এখনো তো ফিরলো না। তারপর সেও খুব চিন্তা যুক্ত মুখে যেতে রাজি হলো। অয়নের দিকে তাকিয়ে দীপা জিজ্ঞাসা করল- আমাদের লাগেজ? অয়ন বলল লাগবে না। দীপাও ভাবলো লাগেজ এভাবেই থাক, ট্রেন চলা শুরুকরলে তো আবার এখানেই এসে বসবো। ভেবে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল আয়ন আমার হাত ব্যাগটা আনতে ভুলে গেছি, ওর মধ্যে তো আমার গহনাও রয়েছে, একটু দাঁড়াও আমি গিয়ে নিয়ে আসি। থাক কিছু হবে না, তুমি আমার সাথে এসো। অয়নের এই অদ্ভুত আচরণ দেখে দীপার খুব বিরক্ত লাগল কিন্তু কেন জানি কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না। সে আর কথা না বাড়িয়ে অয়নের সাথে বগি থেকে বেরিয়ে আসলো। ট্রেন থেকে বের হয়ে খেয়াল করলো ট্রেনের চারপাশে অনেক মানুষ। সবাই টর্চ হতে ট্রেনের মধ্যে দেখার চেষ্টা করছে আর কেন জানি আহাজারি করছে। অয়নের সেদিকে তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই, সে দীপার হাত ধরে সামনের আলোময় বাগানের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর দীপা মুগ্ধ ভক্তের মত অয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে তার হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে থেকে বাগানের দিকে হেঁটে যেতে লাগল। তাদের সাথে সাথে বাচ্চা দুটি খেলতে খেলতে দৌড়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আর বাকি সবাই বেশ চুপচাপ চেহারা নিয়ে হেঁটে চলছে। তারপর আরও কিছুদূর এগিয়ে এসে বাগানের মধ্যে খুব সুন্দর কার্পেটের মত বিছানো ঘাসের উপর একসাথে বসে ট্রেনের দিকে তাকিয়ে রইল সবাই। এখন বাচ্চা দুটিকে দেখে এত মজা লাগছে দীপার মনে হচ্ছে সেও ওদের সাথে খেলতে শুরু করবে। ওদের মা হাসি মুখে বাচ্চাদের সামলাতে ব্যস্ত। ৮ দীপা ভাবল- আসলে বাচ্চা দুটির ট্রেনের মধ্যে ভিড়ে ভালো লাগছিল না বোধ হয়। বাগানের মধ্যে এসে কি সুন্দর খেলছে ওরা, আর ওদের মা খেলার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে বাচ্চার আব্বুর আসার অপেক্ষায় ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দেখছে। নতুন বৌটা একবার তার স্বামীকে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে যেতে দেখে মিলন মিলন বলে চিৎকার করে ডেকে উঠলো। বরটির নাম যে মিলন এইমাত্র জানতে পারলাম। কিন্তু মিলন তার বৌটির কথা শুনতে পেল না। ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছে আর ট্রেনের চারপাশে মানুষের আরও ভিড় জমছে। ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ অস্থির হয়ে ঘুরছে আর কান্নাকাটি করছে। দীপা অয়নের হাত ধরেই বসে রয়েছে বাগানের এক পাশের্^। হঠাৎ সে অয়নকে জিজ্ঞাসা করল, এর আগে এই জায়গাটির কথা তুমি জানতে? এর আগে এসেছো এখানে? না আসিনি- অয়ন শান্তভাবে উত্তর দিল। এবার অয়ন দীপার দিকে বেশ চকচকে চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা দীপা এখন থেকে আমরা যদি এখানেই থেকে যাই তোমার কি খারাপ লাগবে? বাহ! কি ব্যাপার অয়ন বেশি রোমান্টিক কথা বলছো যে? ও হো আজ তো চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস তাই তোমার মুখে এত রোমান্টিক কথা। বলে একটু দুষ্টুমির হাসি হেসে দীপা বলল- শোন অয়ন আমি তোমার সাথে পৃথিবীর যে কোন জায়গায় থাকতে পারি। দীপার উত্তর শুনে অয়ন একটু হাসলো। এর মাঝে আরও অনেকেই এসে তাদের সাথে বসে রইলো আর অপেক্ষা করতে লাগলো কখন ট্রন ঠিক হবে আমরা সবাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিব। এর মধ্যে একবার বাচ্চাদের আব্বু তাদের সামনে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। আপুটা বাচ্চাদের নিয়ে খেলতে এত ব্য¯ত সেটা খেয়ালই করলো না। অনেক সময় বলতে গেলে সারাদিন পর ট্রেন স্বাভাবিক হলো, আসরের আজানও হয়ে গেল। দীপা অয়নকে বলল, কই চলো ট্রেনতো চলে যাবে। আমাদের ব্যাগ বগিতে। কথাগুলো বলতে গিয়ে খেয়াল করল তার কয়েকজন আত্মীয় ট্রেনের কাছে। দীপা তাদের ডাকতে চাইল কিন্তুঅয়ন বারণ করে বলল, থাক দীপা এখানেই বসে থাক। তারপর অয়ন তাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো দীপা আজ থেকে এটাই আমাদের পৃথিবী। আমরা অনন্তকাল একসাথে এই সুন্দর পৃথিবীতে থাকবো। তোমার কি আমার সাথে এখানে থাকতে খুব খারাপ লাগবে? ৯ এ কেমন কথা অয়ন- তোমার সাথে থাকতে খারাপ লাগবে কেন? তাই বলে এখানে কেন থাকবো? আর এই মাঝ পথেই বা আমরা কেন পড়ে থাকবো? আমাদের নতুন সংসার সাজাতে হবে আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে হবে। এখানে বসে থাকলে কি হবে? শোন তোমাকে এত বেশি রোমান্টিক হতে হবে না, একটু সাধারণ হলেও চলবে বুঝেছো বলে হাসল দীপা । অয়ন বেশ গম্ভীরভাবে বলল- দীপা আমাদের আর কোন স্বপ্ন নেই, কোন চাওয়া নেই পাওয়া নেই জীবন নেই। আমারা যে চিরদিনের জন্য অন্য পৃথিবীতে চলে এসেছি দীপা। সামনে তাকিয়ে দেখ সবাই চলে যাচ্ছে। দীপা সামনে তাকিয়ে দেখল একটা বগি ক্রেন দিয়ে নিচের খাল থেকে তুলে এনে মাঠের পাশে রাখা হয়েছে আর তার মধ্যে থেকে অনেকগুলো মানুষের লাশ বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে একটা অয়ন আর একটা তার ছাড়াও আরও অনেকের। দীপার এত ভয় করলো সে অয়নের হাত শক্ত করে ধরে চিৎকার করে বলল আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ওরা? বলে অয়নের হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তার বাবাকে কঁদতে কাঁদতে একজন আত্মীয়ের সাথে এগিয়ে যেতে দেখল দীপা । সে চিৎকার করে বাবা বাবা বলে ডাকলেও কিন্তু কেউ যেন তার কথা কানেই নিল না। সে অস্থির হয়ে অয়নকে জিজ্ঞেস করল- আমি এখানে তো ওটা কাকে নিয়ে গেল অয়ন? অয়ন রহস্য ঘেরা হালকা হাসি মুখে উত্তর দিল আমাদের শরীর। দীপা স্তব্ধ অয়নের পাশে বসে পড়ল, তারপর তাকিয়ে দেখতে থাকল তারপর অয়নের, তারপর বাচ্চা দুটি, এরপর নতুন বৌ, বাচ্চাদের মা আরও অনেককে- একে একে বগির মধ্যে থেকে নিয়ে যাওয়া হল। তারপর একসময় সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল, ভিড় কমতে লাগলো এরপর ট্রেনটাও চলে গেল আর তারা সবাই বাগানটাতেই রয়ে গেল। বাগানটা এখনো আলো ঝলমল করছে। দীপার মনটা খারাপ দেখে অয়ন বলল, চলো একটু ঘুরে দেখবে দীপা? না আমি বাড়ি যাব অয়ন। অয়ন তাকে তার বাহুর মধ্যে নিয়ে বলল, আজ ভালোবাসা দিবস আর আজ তুমি মন খারাপ করলে আমার ভালো লাগবে বল? আর তুমি তো চেয়েছিলে এই ভালোবাসা দিবসে আমরা একসাথে থাকি দেখ আল্লাহ আমাদের মনের আশা পূরণ করেছেন। এখন চল চারপাশটাতে একটু ঘুরে বেড়ায়। কাল যখন আবার রাতের ট্রেন আসবে তখন আমরা সবাই আবার এখানে এসে বসব। কেন অয়ন? কারণ আজ থেকে আমাদের অপেক্ষার পালা শুরু হলো। কোন একদিন একটা ট্রেন এসে আমাদের এখান থেকে ঠিক নিয়ে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিবে। আমাদের গন্তব্য কোথায় অয়ন? ১০ জানি না দীপা । অয়নের কথা শুনে আরও অনেকেই এগিয়ে আসলো তাদের কাছে। তাদের মধ্যে একজন ছেলে বেশ সুন্দর চেহারা স্মার্ট, সে একটু নিজে থেকে এগিয়ে এসে বলল আপা ভয় পাবেন না- এখানে আপনি একেবারে নিরাপদ। এখানে শান্তিএখানে কোন হানাহানি নেই মৃত্যুর ভয় নেই লোভ লালসা কিছু নেই। এখানে যত দিন যাবে তত মনে হবে একটা জঙ্গলে ছিলাম আমারা এখন শান্তির পৃথিবীতে এসেছি। অয়ন ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, আপনি? এখানে কিভাবে এসেছিলেন? আমিও এই ট্রেন করেই এখানে এসেছি। গত বছর যখন ভার্সিটির ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ করলাম মা-বার বার বলল একবার বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসতে যদিও বন্ধুদের সাথে থাকতে ভালোই লাগছিল, তবুও ভাবলাম ঠিক আছে দুদিন বাড়ি যেয়ে ঘুরে আসি মাকে দেখে আসি। সেদিন আমিও রাতের ট্রেনেই উঠেছিলাম। ট্রেন চলছিল আমি একটু হাঁটতে হাঁটতে দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ কয়েকজন ছিনতাইকারী আমার টাকা পয়সা মোবাইল সব কেড়ে নিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ওই ব্রিজের নিচে ফেলে দিয়েছিল। তারপর থেকে আমি এখানে বসেই অপেক্ষা করে চলেছি আমার গন্ত্যব্যে নিয়ে যাওয়ার ট্রেনের। আসলে ওই ট্রেনে যাত্রীদের মধ্যে যাদেরই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে যারা ভালো আত্মা তারা এই বাগানে অপেক্ষা করে চলেছে তাদের গন্ত্যব্যে যাওয়ার ট্রেনের জন্য অনেকে অনেক কাল ধরে। আর যারা খারাপ মানুষ ছিল অথবা নিজেই শেষ হয়ে গেছে তারা এই বাগানে থাকতে পারেনি। আপনারা খেয়াল করেননি আপনাদের সাথে যারা মারা গিয়েছে সবাই কিন্তু এই বাগানে নেই। আপনাদের বগিটা ব্রিজের উপর থেকে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে খারাপ মানুষগুলো অন্য কোন দুনিয়ায় চলে গেছে- যার খবর আমারও জানা নাই। তাহলে এখন কি করব আমরা? দীপা ছেলেটাকে অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করল। কিছুই না। সারাদিন পর যখন মাধ্য রাতে আবার ট্রেনটা এই লাইন দিয়ে যাবে তখন আমরা সবাই এখানে এসে বসে থাকব আর ট্রেনের চলে যাওয়া দেখব। সেই সাথে নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার ট্রেনের অপেক্ষা করব। আর তাদের সেই অজানা গন্তব্যে পৌছে দেওয়ার জন্য আসা ট্রেনের অপেক্ষায় আজ আবার সবাই একসাথে রেল লাইনের দিকে তাকিয়ে বাগানের মধ্যে বসে রয়েছে। এভাবেই তারা প্রতীক্ষায় থাকবে যতদিন না কোন ট্রেন এসে তাদের এখান থেকে নিয়ে সেই অজানা গন্তব্যে পৌছে দেয়। সমাপ্ত।

Post a Comment

0 Comments