অবহেলিত আপন ভাষা : লেখক মোহাঃ ফরিদ উদ্দিন

মোদার গরব মোদের আশা,
আ মরি বাংলা ভাষা।
তোমার কোলে,
তোমার বলে,
কতই শান্তি ভালবাসা।
কবি" অতুল প্রসাদ সেনের" লেখা কবিতার এই চরণ মনে করিয়ে দেয় আপন ভাষার প্রতি মমত্ববোধ,শ্রদ্ধাবোধ,গৌরববোধ।পৃথিবীর সলক জাতিই নিজ নিজ ভাষা নিয়ে গৌরব বোধ করে।আমাদের দেশ স্বাধীনের পূর্বে বাঙালি জাতির জনক " বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন," আমি বাঙালি" তাঁর এই উক্তিতে ফুটে উঠেছে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।কারণ যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে তারাই বাঙালী।
আমরা বাংলাদেশী। আমরা বাঙালি।আমাদের দেশ আজ স্বাধীন।আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।কিন্তু দেশের ভাষা এখনও পরাধীন।যে ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ১৯৫২সালে এদেশের টকবগে কিছু তরুণ বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছে।ভাষা জন্য প্রাণ বিষর্জন দিয়েছে এমন ইতিহাস বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীতে আর নাই।আন্দোলন সংগামের মাধ্যমে বুকের তাজা খুন ঝরিয়ে যে ভাষাকে উজ্জীবিত করা হয়েছে,সেইভাষা নিজেদের দ্বারায় আজ তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল হচ্ছে।
দেশের সর্বত্র আজ এই ভাষা অবহেলিত।এই বাংলা আজ বলায় লেখায় সবখানে হচ্ছে তাচ্ছিল্ল।
আসলে আমাদের হোড়ায় গলদ।১৯৫২ সালে যখন বাংলার জন্য সংগাম হয়েছিল,তখনও সম্রাটআকবর প্রণিত বাংলা সন, মাস চালু ছিল।কিন্তু কোন এক অজানা করণে তখন বাংলায় দিনক্ষণ লিপিবদ্ধ না হয়ে, হয়েছিল ঈসায়ী বা ইংরেজি সন হিসাবে।সেই ধারা বাহিকতায় আজও আমরা ফেব্রুয়রি মাসকে ভাষার মাসস বলে উল্লেখ করি।
যাই হোক বছর ঘুরে আমাদের মাঝে এই ভাষার মাস।এই মাস যখন হাজির তখন আমরা ভাষার বিষয়টি নিয়ে একটু নড়েচনে বসি।তখন বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক সভা- সমাবেশ,আলোচনা,মিটিং ইত্যাদি অনুষ্টঠান করে থাকি।এবং এসব অনুষ্ঠানাদিতে বাংলা ভাষাকে দেশের সকল ক্ষেত্রে চালুর কথা বলে থাকি।এবিষয়ে নানা সিদ্ধান্ত,নানা প্রতিশ্রুতির কথা উঠে আসে।আরো স্মরণ করা হয় ভাষা রফিক, শফিক, সালাম বরকত প্রভিতি ভাষা শহিদদের কথা।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি চলে গেলই আমরা আমাদের প্রশ্রতির কথা,সর্বক্ষেত্রে বাংলা চালুর কথা বিমালুম ভুলে যাই।
দেশের কোন কোন অফিসে বাংলার আংশিক চালু হলেও সব জায়গায় এখনো এটা চালু হয়নি
আসলে আমাদের ভাষাটা হয়ে গেছে বাংলিশ।মানে বাংলা ইংরেজির সংমিশ্রণ। আমাদের মন মগজে ইংরেজি এমন ভাবে জায়গা করেছে যে,বাংলার সাথে ইংরেজি না বললে মনে মর্যাদা হানী হয়ে গেল।এর কারণ হল,নিজ ভাষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নাই,নাই ভালোবাসা।কথায় বথায় ইংরেজি না বললে নিজেকে নাদান মনে হয়,অশিক্ষিত মনে হয়। কিন্তু পৃথিবী সকল মানুষ তার নিজ নিজ ভাষাকে প্রধান্য দিয়ে থাকে।
আমাদের দেশে প্রতিদিনই কোন না কোন টি,ভি কেন্দ্রে বিভিন্ন বিষয়ে সংলাপ ( টক শো) অনুষ্ঠিত হয়।এই সব টকশোতে কোন কোন বক্তা এত পরিমান ইংরেজি শব্দ ব্যাবহার করেন,তার কথা শুনে বোঝা মুশকিল হয় তিনি বাঙালী নাকি ইংরেজ।আবার কোন কোন বক্তা বাংলা বলেন,কিন্তু সঠিক উচ্চাণ করেন না।
যেহেতু ইংরেজ আন্তর্জাতিক ভাষা।তাই আমাদেরকে ইংরেজিও শিখতে হবে তবে বাংলাকে বিষর্জন দিয়ে নয়।দেশের কিছু কিছু কর্তা ব্যাক্তি আছেন, যারা সাক্ষাৎকারের সময়বাংলার চেয়ে ইংরেজি শব্দ বেশি বলে থাকেন।অথচ আমাদের প্রধান মন্ত্রী জন নেত্রী" শেখ হাসিনা" কোন এক বই মেলার উদ্বোধনের সময় তাঁর ভাষণে বলেছিলেন," বাংলার পাশা পাশি ইংরেজি ভাষা শিখতে হবে। কারণ এটা আন্তর্জাতিক ভাষা। তবে বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়।" তিনিও নিজ ভাষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।অথচ আজ আমরা করছি ঠিক এর উল্টোটা।ইংরেজিকে প্রাধান্য দিয়ে পাশাপাশি বাংলা শিখার চেষ্টা করছি।এর উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় আমাদের দেশে নব্য গজিয়ে উঠা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যাপীঠ গুলি।সেখানে কোমলমতি শিশুদের বিদেশি ভাষার বীজ বোপন করা হচ্ছে।এসব কোমল মতি শিশুরা মাতৃ ভাষা বাদ দিয়ে বিদেশি ভাষায় মাকে বলছে,মাম্মী,পিতাকে বলছে,ড্যাডি ইত্যাদি।এর আসল কারণ নিজ ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অভাব।
কবি  অতুল প্রসাদ সেন তার কবিতায় বাংলা ভাষাকে নিয়ে গৌরব বোধ করলেও কবি সুফিয়া কামাল তার কবিতায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন,   
বিদেশ হতে বিজাতীয়
নানান কথার ছড়াছড়ি,
আর কতকাল দেশের মানুষ
থাকবে বল সহ্য করি।
 ( ত্রুটি মার্যনা কামী।)

Post a Comment

0 Comments