একুশে ফেব্রুয়ারি : লেখক আলী হাসান সনি

মাতৃভাষা বাংলা চাই!আমাদের দাবী, আমাদের দাবী মানতে হবে, মানতে হবে।
সেদিন বাঙালী যেন বাংলায় কথা বলতে পারে তার দাবীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন সাধারণ ছাত্র সহ রাজপথে মিছিল আহ্বান করে। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে, যেন কোন মিটিং মিছিল না করা হয়। কিন্তু বাংলার দামাল ছেলেরা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিছিল নিয়ে সামনে এগোতে থাকে। এমন উত্তাল যেন কোন বাধাই তাদের আটকাতে পারবে না। সেই মিছিল ঠেকাতে তৎকালীন পুলিশ মিছিলের উপর গুলি করতে থাকে। নিমিষেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন যুবক। রক্তে ভেসে যায় কালো পিচঢালা পথ। জীবন বিসর্জন হয়ে যায় কয়েকটি তরতাজা প্রানের। তার পর আন্দোলন আরো গভীর  হয়। সতির্থের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল চলে সরকার বিরোধী। সেদিনের ভাষাশহিদদের স্মরণে গড়েতোলা হয় স্মৃতিস্তম্ভ, যার নাম করণ করা হয় শহিদ মিনার। আমরা দেখিনি, তবে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বর্ননায় আমরা অনুভব করেছি- কী ছিলো তাদের দাবী আর কেনইবা জীবন দিতে পিছু হাঁটেনি তাঁরা। স্যারদের গল্পের মাঝে নাম শুনেছি তাঁদের। সেই থেকেই শ্রদ্ধাবনত হয়ে স্মরণ করেছি। ভোরবেলা কিছু ফুল কুড়িয়ে মালা কিংবা তোড়া বানিয়ে খালিপায়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যেতাম শহিদ মিনারে।
শহিদ মিনার সে সময় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিলোনা, কিন্তু যেখানে ছিলো সকল ছাত্রছাত্রী ঐ এক জায়গাতেই গিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতো। একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি খুব শোকাবহ ভাবে কাটতো সকলের। মনে হতো ৫২তে শহিদ হওয়া ছেলেগুলো যেন নিজেদের আপন ভাই। ভাই হারানোর শোক যেন আমাদের বুকের মাঝে দুমড়ে মুচড়ে ফেলতো। আজও বছর ঘুরে ফিরে আসে একুশে ফেব্রুয়ারি। আজ শহিদ মিনার গড়ে উঠেছে  প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে। তা ছাড়াও শহিদ মিনার নির্মান হয়েছে কেন্দ্রীয় ভাবে সকল জেলা উপজেলা শহরে। তবে এখন আর দেখিনা সেই আবেগ, অনূভুতি, উৎকন্ঠা! এখন অনেককেই দেখা যায় শহিদ মিনারে ফুলদিতে জুতাপায়ে উঠতে, ফুলের মালা কে কার আগে দেবে তা নিয়ে তর্ক করতে, কার মালা কত সুন্দর তার আলোচনা আর মালাদিতে গিয়ে ছবি তোলা নিয়ে হুড়োহুড়ি।
এখন একুশ এলে চোখে পড়ে বাহারি পোশাক পরে জুতা সেন্ডেল পায়ে শহিদ মিনারের উপরে উঠে হরেক রকমের সেলফি। আর শাড়ীর আঁচল মাটিতে লুটিয়ে শহিদ মিনারের সিঁড়িতে বসে প্রিয় জনের হাঁটুতে মাথা দিয়ে মনের সুখে সময় পার করতে। স্কুল কলেজেও শিক্ষকরা আর সে ভাবে একুশের সেই চেতনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পড়াতেও শুনিনা। টিভি মিডিয়ার খবরে একুশ সম্পর্কে যেটুকু বলতে শুনি সেটাও ভিন্ন ভাষায়। এসব দেখে নিজেরই মাঝে মাঝে ছোট মনে হয়, কেন যে ওয়েস্টার্ন ভাষায় কথা বলতে পারিনা? ওদের দেখে ওদের মুখের ভাষা শুনে নিজেকে মূর্খ মানুষ বোধ হয়।
বাংলাদেশের আবহাওয়া থেকে যেমন ষড়ঋতু চলে গেছে, তেমনি ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাও হারিয়েছে।
হারিয়েছে বাঙালী তাদের জাতিস্বত্বা, হারাচ্ছে শিক্ষা, সংস্কৃতি,শিল্পি, কবি, সাহিত্যিক।  সেই সাথে হারিয়ে গেছে দাদা বাড়ির বৈঠক খানা, গোয়ালার গোয়াল ঘর, ছনের চালের ঘর, নানী দাদীর গোলা ঘর।
অথচ ফাল্গুনের ঐ দিনে হারিয়েছিলো রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, শফিউর এর মতো যৌবন উচ্ছাসে ভরা প্রান। তাদের সেই হারানো প্রানের বিনিময়ে আজও আমরা গাইতে পারি ভাই হারা একুশের গান! "আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?"

Post a Comment

0 Comments