সাংবাদিক থেকে সম্পাদক একজন আব্দুল বারীর গল্প

হুমায়ূন কবির হিমু ।। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কুষ্টিয়া মিরপুর উপজেলার সাংবাদিকতার ইতিহাস খুব একটা গৌরব উজ্জল নয়। সাংবাদিকতার মাধ্যমে এ উপজেলার অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে নেহায়েতই হাতে গোনা যারা কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন তাঁরা তাদের অভিষ্ট স্থানে পৌছানর আগেই জীবন জীবিকার প্রয়োজনে এ পেশা বদলে অন্য পেশার সাথে সম্পৃক্ত হন।
ফলে দীর্ঘসময় মিরপুর উপজেলার নিগৃত-নিপিড়িত জনসাধারন সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা বঞ্চিত হয়ে অন্যায়-অবিচারের মধ্যে নিপতিত থেকেছে।
উপজেলার সাংবাদিকতা শুন্য এ সময় অনেকটা ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে এক টগবগে যুবকের। যার নাম আব্দুল বারী (৫৬)। এলাকায় যার পরিচয় সাংবাদিক বারী মোল্লা হিসাবে।
পূর্বসূরীদের মতো আব্দুল বারীও সাংবাদিকতাকে সৌখিন পেশা হিসাবে গ্রহন করেন। ছোট বেলা থেকেই তিনি অসাধ্যকে সাধন করার চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহন করতে ভালবাসতেন।
উপজেলার নীমতলার শাহ আলম সাংবাদিকতা করতেন। সাংবাদিক শাহ আলমকে দেখেই আব্দুল বারীর সাংবাদিকতায় আসার শুচনা। পরবর্তীতে শাহ আলম সাংবাদিকতা করার সময় তাঁর একটি লেখার কারনে মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর থেকে তিনি সাংবাদিকতা পেশা বদলে উত্তর বঙ্গের প্রয়াত কৃষক নেতা মারফত আলীর মাধ্যমে বাসের ষ্টাটারীর চাকুরী নিয়েছিলেন।
সৌখিন সাংবাদিকতা এক পর্যায়ে আব্দুল বারীর নেশায় পরিণত হয়। দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠা আব্দুল বারীর পরিবারে তখন লেখাপড়া শেখাটা ছিল অনেকটা বিলাসিতার মতো। তা সত্বেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের অদম্য ইচ্ছা শক্তির কারনে দারিদ্রতা ঘুচানোর সংগ্রামের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। কুষ্টিয়ার মিরপুর পাইলট হাইস্কুল থেকে ১৯৭৯ সালে এস এস সি পাশ করে ভেড়ামারা কলেজে এইচ এস সি, রাজবাড়ী সরকারী কলেজ থেকে ডিগ্রী এবং মানিক গঞ্জের খন্দকার নূরুল হক ল কলেজ থেকে ‘ল’ পাশ করেন।
ভেড়ামারা কলেজে এইচ এস সিতে ভর্তি হবার পর থেকেই অবিভক্ত জাসদ ছাত্রলীগ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। অল্পদিনেই ভেড়ামারা কলেজে তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পান। ‘ল’ পাশ করে আইন পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত না করে সে নেশা আব্দুল বারীকে সাংবাদিকতার মহান পেশা হিসাবে গ্রহন করেন। অল্পদিনেই সাংবাদিকতার মাধ্যমে আব্দুল বারী চলে আসেন পাদ-প্রদীপের নীচে।
৮০ দশকের শুরুতেই আব্দুল বারী কুষ্টিয়া থেকে ওয়ালীউল বারী চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইস্পাত’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে আব্দুর রশীদ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘জাগরনি’ ও দৈনিক ‘বাংলাদেশ বার্তা। একই সাথে আব্দুল বারী ঢাকা থেকে প্রকাশিত তৎসময়ের বহুল আলোচিত সাপ্তাহিক ‘চিত্রবাংলা’ ও ‘সুগন্ধা’ পত্রিকায় লিখতেন। ১৯৮২ সালে ৭ জন সাংবাদিক নিয়ে মিরপুর প্রেস ক্লাব’র আত্ম প্রকাশ ঘটে। প্রতিষ্ঠাকালীন মিরপুর প্রেসক্লাব’র সভাপতি ছিলেন মোহাম্মদ মোস্তফা, সেক্রেটারী ছিলেন আব্দুল বারী।
১৯৮৩/৮৪ সালের দিকে মিরপুর থানায় আব্দুল হাকিম নামের এক চরম অত্যাচারী এস আই ছিলেন। মিরপুরবাসী ওই এস আই আব্দুল হাকিমের কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তৎকালীন মিরপুরের ইউএনও ও ওসিকেও তিনি থোড়ায় কেয়ার করতেন না বলে আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ছিল।দাড়ি থাকার কারনে এস আই হাকিমকে এলাকার অনেক মানুষ খোমেনী বলেও অভিহিত করতেন। তৎকালীন থানার ওসি ছিলেন সাহাবুদ্দিন। অত্যাচারী এস আই আব্দুল হাকিমের নেতিবাচক সব কর্মকান্ড নিয়ে তখনকার তরুণ সাংবাদিক আব্দুল বারী কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক জাগরণী’ পত্রিকায় দারোগার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ শিরোনামে সংবাদ করলেন।
সংবাদটি তৎকালীন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মনসুরুল আজিজের দৃষ্টিগোচর হয়। এসপি তৎকালীন ভেড়ামারা সার্কেল এএসপি বিল্লাল হোসেনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্তে এস আই আব্দুল হাকিমের বিভিন্ন সময় নানা অপকর্মের প্রমাণ মেলে। তদন্ত শেষে এস আই আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে র্যাঙ্ক ডিমোশন করে এস আই থেকে এ এস আই করে দৌলতপুর কোর্টে বদলি করা হয়। বদলি হবার আগে সম্ভু মুদি দোকানে দীর্ঘদিনের বাঁকীতে সদায় নিয়ে ৩ হাজার টাকা ও শওকত হোসেন নামের (বর্তমানে প্রয়াত)মোটর সাইকেল মেকারের ১৬০০ টাকা পাওনা পরিশোধ করেই তাকে মিরপুর ছাড়তে বাধ্য হন। সেই ঘটনার পর থেকেই সাংবাদিক বারী মোল্লার জনপ্রিয়তা মিরপুরের নিগৃত জনসাধারনসহ আপামর জনসাধারনের কাছে আকাশচুম্মী জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
৯৪/৯৫ সালের দিকে কুষ্টিয়া থেকে এম এ শামীম আরজু সম্পাদিত ‘দৈনিক সুত্রপাত’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। (৯৮-২০০৩) সাল পর্যন্ত তিনি গড়াই নদী খনন (জি আর সি)’র প্রশাসনিক কর্মকর্তা (পি আর ও) হিসাবে কর্মরত ছিলেন। ২০০২ সালে ‘দৈনিক আজকের আলো’ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক হন। আব্দুল বারী যথাযথ নিয়ম মেনে ৯৭/৯৮ সালে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্দ্যোগ নিলে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের বাধার মুখে থমকে যায় তাঁর দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্দ্যোগ। ২০০৩ সালের শুরুর দিকে তিনি প্রকাশক ও সম্পাদক হিসাবে প্রকাশ করেন ‘দৈনিক দেশতথ্য’ পত্রিকা। ২০০৪ সালে কুষ্টিয়া সংবাদ পত্র মালিক সমিতি গঠন হলে ‘দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা’র আব্দুর রশীদ চৌধুরী সভাপতি ও আব্দুল বারী সাধারন সম্পাদক নির্বাচিন হন।
২০০৫ সালে দেশের বহুল প্রচারীত প্রাচীন পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এর সম্পাদকের এ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। একই সাথে তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক ভোরের ডাক’ পত্রিকার পার্টটাইম সহকারী সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ও অনলাইন মিডিয়া ‘ডিটি বাংলা.কম’এর সম্পাদক। পরে তিনি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’র যুগ্ম-বার্তা সম্পাদক ও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে একই পত্রিকার মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সময়ে তিনি সাংবাদিকদের সবচেয়ে মর্যাদাপুর্ণ বাংলাদেশ জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ লাভ করেন।
সাংবাদিক আব্দুল বারী কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের মৃত আবেদ আলী মোল্লার ছেলে।

Post a Comment

0 Comments